( ফাইল ছবি) তুরস্ক থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার আগে অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: রয়টার্স
( ফাইল ছবি) তুরস্ক থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার আগে অনিয়মিত অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: রয়টার্স

ইউরোপীয় দেশগুলির অভিবাসন নীতিতে অগ্রাধিকার পায় মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু ‘মানবপাচারকারী’ শব্দটির যথেচ্ছ ব্যবহার কি বাস্তবকে আড়াল করছে? ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেয়া এনজিও নেটওয়ার্ক পিআইসিইউএম এর অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মার্টা জিওনকোর সাক্ষাৎকারে জানুন বিস্তারিত।

অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জন্য নিবেদিত আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত পিআইসিইউএম জুলাইয়ের শেষে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ‘মানপাচারকারী’ শব্দটির ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে বলা হয়েছে৷ এটির যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করে, প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। গণহারে যে কাউকে মানবপাচাকারী আখ্যা দেয়া অভিবাসীদের জন্যে সমান ক্ষতিকারক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। 

বিস্তারিত পড়ুন সাক্ষাৎকারে। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: পিআইসিইউএম নেটওয়ার্ক থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আপনি ব্যাখ্যা করেছেন, মানবপাচারকারীদের নিয়ে আমাদের চারপাশে এখনও অনেক সত্যি মিথ্যে মেশানো গল্প রয়েছে।

মূলত মানবপাচারকারী বলতে মানবপাচার নেটওয়ার্কের সদস্যদের বিবেচনা করা হয়। যেখানে বাস্তবে ভিন্ন ভিন্ন লোকেরা জড়িত থাকতে পারে। যেমন, একজন মানবপাচারকারী নিজেও একজন অভিবাসী হতে পারেন। যাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট অভিবাসন রুটে পাওয়া যেতে পারে। অভিবাসীদের অনেক আত্নীয়ও তাদের হয়ে কাজ করে। এরকম বিভিন্ন ব্যক্তিদের সংখ্যার হারের অনুপাত কী?

মার্টা জিওনকো:

আমরা ইউরোপীয় কমিশনের কাছে বছরের পর বছর ধরে মানবপাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে আসছি। কিন্তু আমাদের কাছে এ বিষয়ে খুব কম তথ্য ও পরিসংখ্যান আছে। বর্তমানে কোনো অভিযুক্তকে মানবপাচারকারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে দীর্ঘ সংজ্ঞা দেয়া হচ্ছে। যা ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ অনুযায়ী নিয়মিত পরিবর্তিত হয়।


উদাহরণস্বরূপ, বেলজিয়াম ও গ্রিসে লোকেদেরকে ‘সেলফ-স্মাগলিং’ বা নিজেদের পাচারের দায়েও অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ তারা অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করেছিল কারণ তাদের কাছে অন্য কোনো উপায় ছিল না। এটি একটি নতুন ধারণা, যার খুব সামান্য আইনি ভিত্তি আছে।

‘মানবপাচারকারী’ শব্দটির সংজ্ঞা এতটাই বিস্তৃত যে এটিতে অভিবাসীদের ভ্রমণে সহায়তা করা পরিবারের অন্য ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে, তিন অভিবাসী ভাইকে তাদের বাবা-মা এবং বোনের অনিয়মিত প্রবেশের অর্থ প্রদানে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক পুনর্মিলনের আবেদন প্রত্যাখ্যানের পরেই তারা বাবা, মা, বোনকে অনিয়মিত উপায়ে আনার চেষ্টা করেছিল। 

পড়ুন>>ইটালি: অভিবাসী মৃত্যুর ঘটনায় আটক পাঁচ সন্দেহভাজন পাচারকারী

অপরদিকে, রোমানিয়ায় আটজন অভিভাবকহীন নাবালকের বিরুদ্ধে অভিবাসী পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল কারণ তারা অভিবাসীদের সঙ্গে অনিয়মিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছিল।

আমাদের কাছে সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান নেই। তবে আমরা নিশ্চিত যে, মানবপাচারে অভিযুক্ত অনেক লোক আসলে তাদের বা তাদের প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে পাচারের কাজে সহায়তা করেছে।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: আমাদের চারপাশে মানবপাচারকারীদের নিয়ে তৈরি গল্পগুলো এখনও এত জোরালো কেন?

মার্টা জিওনকো: প্রায়ই সরকার অভিবাসনকে আরো সীমিত করতে এবং আরো নজরদারি করতে পাচারকারীদের নিয়ে অতিরিক্ত তথ্য ব্যবহার করে।

এটি সীমান্ত বন্ধ করার এবং জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন বাড়ানোর একটি বৈশ্বিক নীতির অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। যা সমুদ্র ও সীমান্ত পারাপারকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। মানবপাচারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন প্ল্যান ২০২১-২০২৫ নামে ইউরোপীয় কমিশনের নতুন একটি পরিকল্পনা রয়েছে। 

পড়ুন>>মানবপাচার চক্রের নেটওয়ার্ক ভাঙার দাবি গ্রিক পুলিশের

এই পরিকল্পনা অপরাধী সাব্যস্ত করায় সবথেকে বেশি জোর দিচ্ছে। এই নীতিগুলিকে অভিবাসীদের জীবন রক্ষার উপায় হিসাবে পরিবেশন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলোতে তাদের ক্ষতি হয়।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: ইটালি ও গ্রিসে যারা অভিবাসী নৌকা চালালোর দায়িত্বে থাকে তাদেরকে চোরাকারবারী হিসাবে বিচার করা হয় এবং কারারুদ্ধ করা হয়। এটা কতটা উদ্বেগজনক?

মার্টা জিওনকো:

এসব ঘটনা বিগত এক দশক ধরে ইউরোপে দেখা গেলেও সম্প্রতি এগুলির প্রবণতা বেড়েছে। নৌকাচালকদের দোষী আখ্যা দিয়ে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অভিবাসীরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে বা কর্মসংস্থানের কারণে সামান্য ভালো থাকার আশায় আসতে বাধ্য হন।

তবে এ নিয়ে ইটালির সর্বোচ্চ আদালত একটি রায় দিয়েছে। মানবপাচারে সহায়তার অভিযোগ উঠা দুই তরুণ অভিবাসীর বিরুদ্ধে একটি মামলার রায়ে আদালত জানায়, পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বিশেষ ক্ষেত্রে “প্রয়োজনীয়তার অধিকার” বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য। এই দুই যুবক সমুদ্রে নৌকাডুবির পরে লিবিয়া ফেরত যেতে চাননি। 

আরও পড়ুন>>বেলারুশের চোরাচালান চক্র ভাঙলো ইউরোপোল

এইসব তথ্য প্রতিনিয়ত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। অভিবাসীরা জানে তারা যদি সমুদ্রে যাত্রা করা নৌকার নেতৃত্বে থাকে ও পাচারকারীদের ডাকে সাড়া দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে তারা। প্রিয়জনকে খুঁজে পেতে, কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বছরের পর বছর জেলে থাকার ঝুঁকিও নেয়। তারা মানবপাচারের মতো কাজে জড়িত হতে আসলে মারাত্মক ভয় পায়।

অভিবাসীদের গণহারে মানবপাচারকারী হিসেবে আখ্যা দেয়ার নির্মম পরিণতি হল, কখনো কখনো তারা নৌকার হাল ছেড়ে দেন বা ইঞ্জিন থেকে দূরে সরে যান, যাতে উপকূলে পৌঁছানোর পর পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়। এর ফলে নৌকাগুলি উল্টে প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকে৷

ইনফোমাইগ্রেন্টস: প্রতিবেদনে অভিবাসীদের প্রতি সংহতিকে অপরাধ হিসেবে দেখার একাধিক চেষ্টার বর্ণনা দিয়েছেন আপনি। এ বিষয়ে ফ্রান্সে একটি আইনি বিতর্ক হয়েছিল ফলে সংবিধানে ভ্রাতৃত্বের নীতি নামে একটি বিষয় প্রবর্তন করা হয়। এই ধরনের উদ্যোগ কি ইউরোপের অন্য কোনো দেশে নেই?

মার্টা জিওনকো: 

আগের চেয়ে পরিস্থিতির বেশ কিছু উন্নতি ঘটেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের অনিয়মিত অভিবাসীদের সীমান্ত পেরোতে সহায়তা করে জেলে যাওয়া আলোচিত কৃষক সেড্রিক হেরোর আদালত থেকে খালাস পাওয়ার ঘটনা বেশ আশাব্যঞ্জক। আদালত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হলেও এরকম জটিল পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। 


তবে সেটা সব দেশে এবং সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেমন, বেলজিয়ামে অনুরূপ অভিযোগে আটক একজন বেলজিয়ামের নাগরিককে বেকসুর খালাস দেওয়া হলেও অভিবাসীদের নির্বাসনের শাস্তি দেয়া হয়। অথচ এক্ষেত্রে তাদের কোনো দোষ ছিল না। অভিবাসীরা এই অপরাধীকরণের অসম বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইউরোপের অনেক দেশে এখনও অভিবাসীদের প্রবেশে সহায়তা সম্পর্কিত অনেক মামলা চলছে। 

২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের মার্চের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনিয়মিত অভিবাসীদের ভ্রমণে সহায়তার দায়ে কমপক্ষে ৮৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

ইউরোপীয় স্তরে কাউকে ‘মানবপাচারকারী’ সাব্যস্ত করার আইনি সংজ্ঞা পরিবর্তন করা দরকার। মানবপাচারে যারা বিপুল পরিমাণ অর্থের সুবিধাভোগী তাদেরকে অপরাধী হিসাবে ধরতে হবে।  

পড়ুন>>মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াই, নতুন চুক্তি স্বাক্ষর ইইউ-নাইজারের

নইলে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে কোনো বাস চালক যদি যাত্রীদের কাগজপত্র পরীক্ষা না করে শুধুমাত্র একটি টিকিটের মাধ্যমে গণপরিবহনে তোলেন তাকেও অপরাধী সাব্যস্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। 

এর ফলে প্রত্যেক নাগরিক সীমান্তরক্ষীতে পরিণত হবে। আমাদের এমন লোকদের উপর নজর রাখতে হবে যারা আসলে মানবপাচারের মাধ্যমে অবৈধ মুনাফা লুটছে, অর্থের জন্য অন্যদের শোষণ করছে।


মূল প্রতিবেদন মায়া কুর্তুয়া। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/আরকেসি


 

অন্যান্য প্রতিবেদন