আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন সাবেক স্কুল শিক্ষিকা শুকরিয়া। তিনি বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাস করছেন। ছবি:  ইনফোমাইগ্রেন্টস
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন সাবেক স্কুল শিক্ষিকা শুকরিয়া। তিনি বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাস করছেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

শুকরিয়া, বিবিতাবো ও নোয়াগা; এই তিন আফগান শরণার্থী এখন নিরাপদে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন৷ কিন্তু আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের অধীনে থাকা প্রিয়জনদের জন্য তাদের উদ্বেগের শেষ নেই৷ ১৫ আগস্ট কাবুল পতনের এক বছর পূর্তিতে ইনফোমাইগ্রেন্টস কথা বলেছে এই তিন আফগানের সাথে৷ বিস্তারিত পড়ুন সাক্ষাৎকারে

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল পতনের দিন৷ এদিন মার্কিন বাহিনী দেশটি থেকে সবশেষ সেনা প্রত্যাহারের পর ক্ষমতা দখল করে তালেবান৷ কেড়ে নেয়া হয় দেশটির নারীদের পড়াশোনা, চলাফেরা ও কাজের স্বাধীনতা৷ 

ফ্রান্সে বসবাস করা আফগান শরণার্থী শুকরিয়ার জন্য ১৫ আগস্ট ‘একটি কালো দিন’৷ ২৫ বছর বয়সি এই সাবেক শিক্ষিকা বলেন, “১৫ আগস্টে আফগানিস্তানে আবারও একটি কালো যুগের সূচনা হয়েছে৷’’

চসে সময় রাজধানী কাবুলের একটি অ্যাপার্টমেন্টে আটকে থাকার কথা স্মরণ করে শুকরিয়া জানান, ‘‘আমি খুব দুঃখিত ছিলাম কারণ আমি আমার চাকরি এবং স্কুলের ছাত্রদের খুব ভালোবাসতাম৷ কিন্তু সর্বোপরি আমি ভয় পেয়েছিলাম৷ কোন প্রকার বেতন ছাড়া, আমি কীভাবে আমার ৬ বছর বয়সি কন্যার ভরণপোষণ চালিয়ে যাব?’’

সেদিনের পরপরই তালেবান আফগানিস্তানের জনগণের ওপর আবারও অতীতের মতো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে৷ শুকরিয়া জানান, ‘‘দেশটির সবগুলো সরকারি খাতে নারীদের কাজে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে৷’’

পড়ুন>>ফাঁদ টিকটকেও, মাদকপাচারে অভিবাসীদের ‘ব্যবহার’, ধৃত ৫

কাবুল বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছাড়ার জন্য দুই দুইবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি৷ এক মাস পর বাসে করে ইরানের পৌঁছান তিনি৷ পরে পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসার মাধ্যমে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্যারিসে পৌঁছাতে সক্ষম হন শুকরিয়া৷ আফগানিস্তানের সাবেক এই শিক্ষিকা আজ তার নিজের জীবন নিয়ে নিরাপদ বোধ করলেও নিজ দেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের জন্য ভীষণ উদ্বিগ্ন৷ 


তালেবানের কাবুল দখলের পর  পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসায় ফ্রান্সে আসার সুযোগ পেয়েছেন বহু আফগান শরণার্থী। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
তালেবানের কাবুল দখলের পর পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসায় ফ্রান্সে আসার সুযোগ পেয়েছেন বহু আফগান শরণার্থী। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


এক বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণের পর তালেবান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আগের চেয়ে ভালো মনোভাব দেখানোর চেষ্টা করে৷ কিন্তু বাস্তবে জনগণের উপর তারা ঠিকই তাদের কঠোর মতবাদ প্রয়োগের চেষ্টা করে আসছে৷ অন্যদিকে ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এই গোষ্ঠী৷

পড়ুন>>জার্মানির পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

বর্তমানে বৃহত্তর প্যারিসের ম্যাসি অঞ্চলে অবস্থিত একটি শরণার্থী আবাসন কেন্দ্রে আছেন শুকরিয়া৷ তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন,‘‘আমি আফগানিস্তানে আটকা পড়া আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চিন্তিত৷ আমার চাচা আগের সরকারের আমলে একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে কর্মরত থাকায় বর্তমানে আত্নগোপনে থেকে জীবন যাপন করছেন৷ আমার এক চাচাতো ভাই একজন সাংবাদিক৷ তিনিও বর্তমানে বেনামে এবং গোপনে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন৷’’

 পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

প্রিয়জনদের ছেড়ে এমন যন্ত্রণা নিয়ে বর্তমানে ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন হাজারো আফগান শরণার্থী৷ অনেকে আশ্রয় আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসায় নিকট স্বজনদের আনার পদক্ষেপ নিয়েছেন৷

অভিবাসন সংস্থা লা সিমাদের ব্যবস্থাপক জুলি বেরৌ বলেন, “বেশ কয়েক বছর ধরে আফগানদের পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা প্রক্রিয়াগুলো বেশ দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠেছে৷ পরিবারের সাথে সম্পর্ক প্রমাণে প্রায়ই পারিবারিক ছবি, চিঠিপত্র, কথোপকথনের স্ক্রিনশট প্রদান করতে বলা হয়৷’’

পড়ুন>>গ্রিসে প্রবেশে ব্যর্থ নারীর নৌকায় সন্তান প্রসব

৬৩ বছর বয়সি আরেক আফগান শরণার্থী বিবিতাবো আফগানিস্তানে থাকা তার ৩০ বছর বয়সি মেয়ের কথা উল্লেখ করতেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেন নি। 

তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “আমার সাথে নিয়মিত কথা হলেও আমি সত্যিই তার জন্য ভয়ে থাকি৷’’

কাবুলের নিকটবর্তী পারওয়ান অঞ্চলের এই আদিবাসী ইরানে যাওয়ার আগে তালেবান আমলে কয়েক মাস আফগানিস্তানে বসবাস করেন৷


সন্তানের সাথে ৬৩ বছর বয়সি আফগান শরণার্থী বিবিতাবো। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
সন্তানের সাথে ৬৩ বছর বয়সি আফগান শরণার্থী বিবিতাবো। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


তিনি জানান, ‘‘আমাদেরকে একজন পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি৷ আমাদেরকে খোলা রাস্তায় একটি দীর্ঘ তার দিয়ে পায়ে আঘাত করা হয়েছিল৷ এ ঘটনার পর আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম৷ ইরানে আসার আগে বাকি দিনগুলোতে আমি আমার বাড়িতেই ছিলাম৷’’

আফগানিস্তানের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছেন, ‘‘আমাকে একদিন একা রাস্তায় হাঁটা অবস্থায় আটক করা হয়েছিল৷ তালেবান সদস্যরা আমার কাঁধে, মুখে, ঘাড়ে বৈদ্যুতিক শক দিতে দিতে বেশ্যা এবং কুত্তা বলে গালি দিতে থাকে৷ তারা ঘাড়ে বন্দুক রেখে বলে, আমরা তোমাকে মেরে ফেললে কেউ তোমার লাশ খুঁজে পাবে না’৷’’

পড়ুন>>মরিয়া অগ্নিকাণ্ডে জড়িত আফগান তরুণদের শাস্তি কমালো গ্রিস

বিবিতাবোও তার দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের চরম দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় ভুগছেন, যা দিনকে দিন তীব্রতর হচ্ছে৷ হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের মতে, আফগানিস্তানের প্রায় দুই কোটি মানুষ বা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ২০২১ সালের জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে৷ ১১ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগেছে৷

আন্তজার্তিক এনজিও হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের মতে, “আফগানিস্তানের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করছে৷’’ 

শরণার্থী বিবিতাবো বলেন, “সেখানের মানুষের খাওয়ার জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন৷ কিছু প্রদেশে মানুষ এতটাই মরিয়া যে তারা তাদের কিডনি বিক্রি করে দিচ্ছে৷ পশ্চিম আফগানিস্তানের শহর হেরাত অঞ্চলে এই ঘটনা প্রকট আকার ধারণ করেছে৷’’

শহরের বাসিন্দা নুরউদ্দিন ফেব্রুয়ারিতে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘‘আমার কাছে কিডনি বিক্রি ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না৷ আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য আমাকে এটা করতে হয়েছে৷’’

বোরখা ও নিকাব না পরায় গ্রেপ্তার

দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে ২৩ বছর আগে দেশ ছেড়েছিলেন ৩৭ বছর বয়সি আফগান শরণার্থী নোয়াগা৷ সে সময় তালেবানরা প্রথম দফায় ক্ষমতায় ছিল৷ তখন তারা মেয়েদের স্কুলে পড়া নিষিদ্ধ করে৷ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরও মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায়ও নানা বাধা আরোপ করে তারা৷ 


দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে ২৩ বছর আগে দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে আসেন ৩৭ বছর বয়সি আফগান শরণার্থী নোয়াগা। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে ২৩ বছর আগে দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে আসেন ৩৭ বছর বয়সি আফগান শরণার্থী নোয়াগা। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


নোয়াগা ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, একটা দেশের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে৷ “কীভাবে তারা বলে নারীদের কোন অস্তিত্ব নেই?,” প্রশ্ন নোয়াগার৷

তিনি স্ত্রী ও কাবুলে থাকা তার চাচাতো ভাই সম্পর্কে উদ্বেগ জানাতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন৷ 

নোয়াগা জানান, “দুই সপ্তাহ আগে আমার স্ত্রীকে রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কারণ তার অপরাধ পুরোপুরি নেকাব পরিধান করেনি৷ তালেবান জনসম্মুখে নারীদের মুখমণ্ডল পুরোপুরি ঢেকে রাখতে বাধ্য করে৷’’

পড়ুন>>গাড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি, তুরস্কে হত আফগান শিশু

তিনি বলেন, “আমি খুব চিন্তিত৷ যেদিন থেকে তার গ্রেফতারের খবর পেয়েছি এরপর থেকে তার সাথে আমার আর কোন কথা হয়নি৷’’


এমএইউ/এফএস








 

অন্যান্য প্রতিবেদন