ত্রিপোলির প্রায় ১২০ কিলোমিটার পূর্বে খোমসে লিবিয়ার উপকূলরক্ষীরা সমুদ্র থেকে অভিবাসীদের  নিজেদের জাহাজে তুলে নেয়৷ ছবি: এপি ছবি/হাজেম আহমেদ, ফাইল
ত্রিপোলির প্রায় ১২০ কিলোমিটার পূর্বে খোমসে লিবিয়ার উপকূলরক্ষীরা সমুদ্র থেকে অভিবাসীদের নিজেদের জাহাজে তুলে নেয়৷ ছবি: এপি ছবি/হাজেম আহমেদ, ফাইল

মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য লিবিয়ায় অর্থায়ন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আবারো এমন অভিযোগ এনেছেন অভিবাসীরা৷

অত্যাচার, চাঁদাবাজি এবং হত্যার হুমকির ফলে উত্তর আফ্রিকার দেশ থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া অভিবাসীরা এই অভিযোগকে সমর্থন করছেন, সরব হচ্ছেন৷

 আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর মতে, চলতি বছরের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার অভিবাসীকে লিবিয়ায় আটক করা হয়েছে এবং ফেরত আনা হয়েছে। 

 ২০২১ সালে লিবিয়া কর্তৃপক্ষ ৩২ হাজার ৪৫০ জনকে ইইউতে খাতায়কলমে প্রবেশ আটকে দেয়৷ অভিযোগ আনা হয়েছে, "যথেচ্ছ আটক ও অত্যাচারের জন্য জোর করে ফেরত পাঠানো হয়।"

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ, লিবিয়ায় "অভিবাসী ও শরণার্থীদের নির্যাতন ও শোষণের যথেষ্ট প্রমাণ" রয়েছে৷ তবুও লিবিয়ার উপকূলরক্ষীকে ড্রোন ব্যবহার করে তথ্যের মাধ্যমে সাহায্য করা হচ্ছে। 

২০২১ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই ধরনের গুরুতর অপব্যবহারের রিপোর্টের উল্লেখ রয়েছে যেখানে লিবিয়ায় আটক অভিবাসীদের উপর "হত্যা, দাসত্ব, নির্যাতন, কারাবাস (এবং) ধর্ষণ"-এর মতো নৃশংস অত্যাচারের উদাহরণ রয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, এইগুলি আসলে মানবতাবিরোধী অপরাধ।

লিবিয়া কর্তৃপক্ষ যদিও অভিবাসীদের নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এক অভিবাসন কর্মকর্তা সংবাদসংস্থা এএফপিকে বলেছেন, "নিয়ম অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয়েছে৷"

অভিবাসীদের আটক করার ধরনগুলিও যথেচ্ছ অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম মেনে আটক করা হয় এমনটা নয় ৷ 

অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রায়ই সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে আটক করা হয় এবং দীর্ঘদিন তাদের আটকে রাখা হয়। লিবিয়ায় সাধারণ আটকের ঘটনাগুলিও যথেচ্ছভাবে ঘটে৷

অভিবাসীদের ফেলে আসার অভিযোগ

যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে অভিবাসী আটক কেন্দ্রগুলিতে নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশদ বিবরণসহ এনজিও এবং বার্তাসংস্থাগুলি অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক কৌশলের অংশ হিসাবে, ইইউ লিবিয়ার উপকূলরক্ষীদের অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে

২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল লিবিয়ার মিসরাতায় লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনী অভিবাসীদের আটক করে৷ ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/হাজেম তুর্কিয়া/এএ
২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল লিবিয়ার মিসরাতায় লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনী অভিবাসীদের আটক করে৷ ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/হাজেম তুর্কিয়া/এএ

আর্থিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে৷ পাশাপাশি, ইইউর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ব্লকের সদস্য রাষ্ট্রগুলি অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে যথেষ্ট তৎপর নয়৷ 

চলতি মাসের শুরুতে মাল্টা সরকারের বিরুদ্ধে অ্যালার্ম ফোন নামের একটি সংস্থা অভিযোগ এনেছে৷ 

অভিবাসীদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ার জন্য মাল্টাকে অভিযুক্ত করেছে তারা৷ এই সংস্থা সমুদ্র এবং স্থলভাগে দুর্দশাগ্রস্ত অভিবাসন প্রত্যাশীদের সাহায্য করে৷

অ্যালার্ম ফোন জানিয়েছে, অসংখ্যবার এই অ-সহায়তা নীতির সাক্ষী তারা৷ সংস্থার অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নৌকাগুলিকে সাহায্য করেনি মাল্টা৷

ভূমধ্যসাগর জুড়ে বিভিন্ন জাতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীকে সহায়তা করছে ফ্রন্টেক্স ৷ ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/কে। নিটফেল্ড
ভূমধ্যসাগর জুড়ে বিভিন্ন জাতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীকে সহায়তা করছে ফ্রন্টেক্স ৷ ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/কে। নিটফেল্ড


'একসঙ্গে অভিবাসন বন্ধ করুন'

লিবিয়ার মাটিতে, অভিবাসীরা স্পষ্টভাবে তাদের মতমত জানিয়েছেন। সংবাদসংস্থা এএফপিকে রাজধানী ত্রিপোলিতে আটকে থাকা সুদানের অভিবাসী ২৬ বছর বয়সি হুসেন বলেন, "লিবিয়ায় কোনো মানবাধিকার নেই।" 

২০১৭ সালে রাতারাতি নৌকা পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি৷ উপকূলরক্ষীদের হাতে ধরা পড়ার আগে তাকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এরপর পালানোর আগে তাকে একদিন আটকে রাখা হয়।

হুসেন বিশ্বাস করেন, "অভিবাসন বন্ধ করার জন্য লিবিয়াকে অর্থায়ন করার বদলে ইউরোপীয় দেশগুলিকে অন্য উপায় ভাবতে হবে ৷ আফ্রিকার যে দেশগুলি থেকে অভিবাসীরা ইউরোপে আসেন, তাদের দেশ ছাড়া থেকে নিরুৎসাহিত করতে অনেক কিছু করতে হবে।

 আশায় বেঁচে থাকা

হুসেনের তুলনায় আরো অনেক খারাপ পরিণতি হয় অভিবাসীদের অনেকেরই।

গডউইন নামে ৩৪ বছর বয়সি নাইজেরীয় অভিবাসী এএফপিকে বলেন, অভিবাসীবোঝাই নৌকায় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইটালিতে যেতে মানবপাচারকারীদের ১১০০ ইউরো দিতে বাধ্য হন তিনি৷ এরপর লিবিয়ার টহলদাররা তাকে আটক করেছিল।

গডউইন বলেন, লিবিয়া কর্তৃপক্ষর হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়েন এবং লিবিয়ায় ফিরে আসেন, সেখানে তাকে আটকে রাখা হয়।

তার কথায়, ‘‘আমি শুধু ইউরোপে যেতে চেয়েছিলাম, একটু ভালভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম৷’’

গডউইনের পরিবার ৫৫০ ইউরো মুক্তিপণ দেওয়ার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। আটকের সময় তার কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা বিশদভাবে বলেননি, বা চাঁদাবাজি সংক্রান্ত আচরণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেননি গডউইন। আটক অভিবাসীদের বিরুদ্ধে লিবিয়ার ইইউ-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ চরম দুর্ব্যবহার করে এমন অভিযোগ এনেছেন অনেকেই।

গডউইন তবুও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে অর্থ সঞ্চয় করছেন৷ তিনি এএফপিকে বলেন, ‘‘এখন আমি লিবিয়ায় আছি, কষ্টে আছি, কোনো কাজ নেই, খাওয়ার মতো খাবার নেই, কিছুই নেই৷‘‘ তার কথায়, ‘‘এখানে যেভাবে বেঁচে আছি, সেভাবে বেঁচে থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত৷’’

 

আরকেসি/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন