(ফাইল ছবি) সাহারা মরুভূমিতে ঝুকিতে থাকা অভিবাসীদের উদ্ধারে একটি অভিযান। ছবি: এলার্ম ফোন সাহারা
(ফাইল ছবি) সাহারা মরুভূমিতে ঝুকিতে থাকা অভিবাসীদের উদ্ধারে একটি অভিযান। ছবি: এলার্ম ফোন সাহারা

ভূমধ্যসাগরকে সবচেয়ে ভয়ংকর রুটগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে আখ্যা দেয়া হলেও ইউরোপে অভিমুখে আসার পথে বেশ কয়েকটি অভিবাসন রুট রয়েছে যেগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক হলেও তেমন আলোচিত নয়। সাহারা মরুভূমি এমনই একটি অঞ্চল। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে ইনফোমাইগ্রেন্টস কথা বলেছে আন্তজার্তিক রেডক্রস কমিটির লুসিল মারবুরের সাথে।

বিশ্বজুড়ে ৩০ আগস্ট পালিত হলো আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। অন্যান্য ব্যক্তিদের ন্যায় প্রতিবছর ইউরোপে পৌঁছতে গিয়ে নিখোঁজ হন হাজারো অভিবাসীা। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে উপলক্ষে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেয়া আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) আঞ্চলিক প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র লুসিল মারবুর সাক্ষাৎকারটি নীচে দিয়ে হল। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: বর্তমানে কতজন নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান করছে রেডক্রস?

লুসিল মারবু: ইউরোপে আসার পথে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া অভিবাসীদের জন্য রেডক্রস ‘ট্রেস দ্য ফেস’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। এই প্ল্যাটফর্মটি একটি ডাটাবেস যা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের শনাক্ত করতে সহায়তা করে। এটির সাহায্যে উভয়পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।

ইউরোপের বহিঃসীমান্তে এসে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

২০২১ সাল পর্যন্ত এই প্লাটফর্মে ১৬,৫০০ জন ব্যক্তি ২৫,৬০০ জন অভিবাসীর সন্ধানে যুক্ত হয়েছেন। ‘ট্রেস দ্য ফেস’ প্লাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে প্রতি সপ্তাহে একটি পরিবার তাদের পরিবারকে খুঁজে পান। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে কোন দেশগুলোর নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব বেশি?

লুসিল মারবু: ‘ট্রেস দ্য ফেস’ প্লাটফর্মে নিবন্ধিতদের মধ্যে প্রচুর আফগান রয়েছে। অন্যান্য সর্বাধিক প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয়তাগুলো হল সিরীয়, ইরিত্রীয়, ইরাকি এবং সোমালি। এর বাইরে কঙ্গো এবং টিউনিশিয়ার নাগরিকরাও আছেন। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: অনেকের মতে ২৫,৬০০ ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যাটি অত্যন্ত কম, আপনি কি মনে করেন?

লুসিল মারবু: সমুদ্রে নৌকাডুবির ফলে অনেকেই ডুবে যায় যাদের পরে আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। অনেক সময়, পুরো নৌযানটির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। এই ক্ষেত্রে অনেকে কোনো প্রকার সাক্ষী ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে যায়।


পাশাপাশি, এমন পরিবারও থাকতে পারে যারা তাদের প্রিয়জনের নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের প্লাটফর্মে যোগাযোগ করেন না। এ কারণে অনেকেই আমাদের ডাটাবেসে গণনায় আসে না।

আমরা এটাও জানি যে, কিছু সীমান্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক (ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের) বা এজিয়ান সাগর খুবই বিপজ্জনক বলে পরিচিত। তবে ঝুঁকি এসব অঞ্চলের বাইরেও ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরুপ, সাহারা মরুভূমি অজ্ঞাতনামা অভিবাসীদের জন্য একটি বিরাট কবরস্থান হিসেবে পরিচিত। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: অভিবাসন রুটে মানুষ কীভাবে উধাও হয়?

লুসিল মারবু: অভিবাসন রুটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিখোঁজ হয় সমুদ্রে। তবে এর বাইরে ইউরোপীয় মহাদেশের বহিঃসীমান্তেও অভিবাসীরা নিখোঁজ হয়। বিশেষ করে যখন তারা বলকান রুটসহ বিভিন্ন স্থল সীমানা অতিক্রম করার চেষ্টা করেন।

অনেক অভিবাসীরাই সীমান্তে এসে দেশে থাকা তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। 

পড়ুন>>ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের আদ্যোপান্ত

আবার অনেকের ফোন চুরি বা হারিয়ে যায়। অভিবাসীরা যদি তাদের আত্মীয়দের টেলিফোন নম্বর মুখস্থ না রাখে তাহলে পরবর্তীতে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে অসুবিধা হয়।

অনেক পরিবার এভাবে মাসের পর মাস তাদের সদস্যদের কোনো খবর ছাড়াই অপেক্ষায় থাকেন।

সব নিখোঁজ ব্যক্তি কিন্তু মারা যায় না। কিছু অভিবাসী বেঁচে থাকেন কিন্তু আমরা তাদের খুঁজে পাই না অথবা তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছি না। একই দেশে থেকেও দুই ভাইবোন বহু বছর ধরে বিচ্ছিন্ন থাকার আশ্চর্যজনক ঘটনাও রেডক্রস দেখতে পেয়েছে।

জার্মানিতে থাকা দুই অভিবাসী ভাই একে অপরের থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থেকেও একে অপরকে দীর্ঘদিন ধরে খুঁজছিলেন।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: অভিবাসীদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন যাতে তারা তাদের প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ না হারায়?

লুসিল মারবু: আমরা লক্ষ্য করেছি, সীমান্ত অতিক্রম করার সময় অনেক লোক তাদের প্রিয়জন ও পরিবারের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। রুটে অন্য অভিবাসীদের সাথে সংঘবদ্ধ থাকা এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায়শই, কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সীমান্তে থাকা পরিবারগুলোকে আলাদা করে। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আমরা সরকারগুলোকে সুপারিশ করি৷

অভিবাসীরা তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য অনেকগুলো কাজ করতে পারে, তাদের পরিবারের সাথে নিয়মিত কথা বলা, তারা যে দেশে যেতে চান এবং যে দেশে অবস্থান করছেন সে সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা, পরিবারের সদস্যদের টেলিফোন নম্বর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড মুখস্থ রাখা। এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন ড্রাইভ কিংবা মেইলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নথিভুক্ত করে রাখাও সহায়তা করতে পারে। যাদের অক্ষর কিংবা প্রযুক্তিগত জ্ঞান নেয় তারা চাইলে কারো সাহায্যে অনেকগুলো ছোট কাগজে গুরুত্বপূর্ণ নাম্বারগুলো লিখে রাখতে পারেন। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: প্রিয়জনদের উপর অন্তর্ধানের কেমন প্রভাব পড়ে?

আমরা প্রায়ই পরিবারগুলোর মনস্তাত্ত্বিক এবং মানসিক কষ্টের কথা বলি। এটা সত্যিই বেদনাদায়ক। কারণ তাদের পরিবার জানেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মৃত নাকি এখনও জীবিত।

পড়ুন>>সাগরে মৃত ও নিখোঁজ অভিবাসীদের পরিচয় জানতে নতুন প্রযুক্তি

এছাড়া পরিবারগুলোর সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে খুব কম কথা বলা হয়। একজন নিখোঁজ ব্যক্তি যদি একটি পরিবারের প্রধান অর্থ যোগানদাতা হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে তাদের পক্ষে পরিবার সামলে নেয়া অসম্ভব হয়ে উঠে। সংশ্লিষ্ট পরিবারটি আর্থিকভাবে আরও বঞ্চিত হতে থাকেন।

তার উপর, একজন ব্যক্তির অন্তর্ধান প্রক্রিয়া কয়েক দশক ধরে চলতে পারে। তার সাথে জড়িতদের প্রশাসনিক মর্যাদার প্রশ্ন উঠতে পারে; কখন একজন স্ত্রীকে বিধবা বলে গণ্য করা হবে কিংবা সে কি তার মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে আসলে ভাগ পাবে কি না, এমন অনেক প্রশ্নই সচরাচর উঠে আসে। 

এই কারণেই, রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট নিখোঁজদের পরিবারগুলোকে মানসিক সহায়তা দিতে স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটিতে মনো-সামাজিক কর্মশালা এবং আর্থিক সহায়তা (প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ইত্যাদি) প্রদানের মাধ্যমে বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি পরিবারের সবচেয়ে প্রধান চাহিদা বিবেচনায় নেয়া।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: রেডক্রস কীভাবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে কাজ করে?

লুসিল মারবু: এটি সত্যিই শ্রমসাধ্য একটি কাজ। আমরা দুটি ভিন্ন দিক থেকে কাজ করি। প্রথমত কোন পরিবার যদি আমাদের সাইটে নিবন্ধন করে সেক্ষেত্রে তারা আমাদের প্রাথমিক তথ্য ও ছবি প্রদান করেন। 

তবে সবাই সব তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। এই ক্ষেত্রে, আমরা নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি খুঁজে বের করতে এবং যতটা সম্ভব তথ্য পুনরুদ্ধার করতে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করি। 

তারপর, আমরা একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ শুরু করি। আমরা গবেষণা চালানোর জন্য আন্তজার্তিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) এবং স্থানীয় রেডক্রসের প্রতিনিধিদের সাথে তথ্য বিনিময় করি।

পড়ুন>>সাগরে প্রাণ হারানো অভিবাসীদের জন্য দক্ষিণ ইটালিতে কবরস্থান

এছাড়া, নিখোঁজ অভিবাসীদের তথ্য বিভিন্ন উপায়ে পাওয়া যেতে পারে। যেমন একটি নৌকাডুবির পরে বেঁচে থাকা অভিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, যেসব সম্ভাব্য অভিবাসীদের নৌকায় ওঠার কথা ছিল কিন্তু বিভিন্ন কারণে পারেনি তাদেরকে প্রশ্ন করে এবং যিনি অভিবাসীদের নৌকায় তুলেছেন তাকে জেরা করে। 

এছাড়া নৌকায় অভিবাসীদের সঠিক সংখ্যা জানতে এবং যাত্রীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে অনেক তথ্য বের করা যায়। কারণ শেষ মুহূর্তে নৌকায় উঠার আগে অভিবাসীরা তাদের প্রিয়জন এবং পরিবারের কাছে কথা বলে বিদায় নেন। 


যখন আমরা কোনো মৃতদেহ খুঁজে পাই, তখন আমরা কখনও কখনও তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সঙ্গে থাকা নথিগুলো পুনরুদ্ধার করি৷ যেমন: পাসপোর্ট, স্কুল বা টিকা দেওয়ার রেকর্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কাগজের টুকরোতে উল্লেখ করা টেলিফোন নম্বর ইত্যাদি।

এই সমস্ত তথ্য আমাদের গবেষণা তালিকাকে সমৃদ্ধ করে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ফাইল তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠে। সকল প্রক্রিয়া শেষ হলে আমরা সংশ্লিষ্ট অভিবাসীদের ব্যাপারে নিশ্চিত হলে খোঁজ করা ব্যক্তিদের প্রিয়জনদের আমরা দ্রুত জানানোর চেষ্টা করি। 

পড়ুন>>

তবে, আমরা কোনো মৃত্যু সনদ বা ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ প্রদান করি না। শুধুমাত্র ভুক্তভোগী অভিবাসী মৃত কিংবা জীবিত এই উত্তর দিয়ে থাকি।

উদাহরণস্বরুপ, আমাদের প্রথম কাজ ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল এর নৌকাডুবির ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা নৌকাটিতে থাকা প্রায় ৫০০ জন অভিবাসীর নাম তালিকাভুক্ত করেছি। যা নৌকাটিতে ধারনা করা যাত্রী সংখ্যার অর্ধেক। এটা করতে আমাদের চার বছরের বেশি সময় লেগেছে।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: নিখোঁজ প্রিয়জনকে খুঁজতে গেলে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

লুসিল মারবু: আপনাকে প্রথমে স্থানীয় রেডক্রসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। (যোগাযোগের বিশদ বিবরণের জন্য, এখানে ক্লিক করুন।)

আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সমুদ্রে নৌকাডুবির ঘটনার পর সময় যত বেশি পার হয়, একজন নিখোঁজ অভিবাসীর পরিচয় খুঁজে পাওয়া তত বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। 

তাই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিবারগুলোর উচিত তাদের দেশে থাকা নিকটস্থ রেড ক্রস কমিটির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা। সেখানে থাকা কর্মীরা পরবর্তীতে আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে।

পড়ুন>>ইটালিতে জোরদার হচ্ছে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের আন্দোলন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিন্তু একজন ব্যক্তির পরিচয়পত্রের নথি নয়। সেটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তারা কোথা থেকে যাত্রা করেছিল, কার সঙ্গে, কতজন অভিবাসী নৌকায় ছিল এবং যাত্রার আগে অন্য কোনো বন্ধুর এসব বিষয় জানা ছিল কি না। এই ধরনের বিবরণ আমাদেরকে দ্রুত একজন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় বের করতে সাহায্য করতে পারে।


এমএইউ/এআই


 

অন্যান্য প্রতিবেদন