প্যারিস অঞ্চলের আলোচিত ভাঁসেন ডিটেনশন সেন্টার বা সিআরএ। এই কেন্দ্রটি ২৩৫ জন অভিবাসী রাখার ধারণক্ষমতার সম্পন্ন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
প্যারিস অঞ্চলের আলোচিত ভাঁসেন ডিটেনশন সেন্টার বা সিআরএ। এই কেন্দ্রটি ২৩৫ জন অভিবাসী রাখার ধারণক্ষমতার সম্পন্ন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

প্যারিস অঞ্চলের ভাঁসেন প্রশাসনিক আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি অনেক অভিবাসীর স্বাস্থ্যের অবস্থা বেশ নাজুক৷ এমনই একজন ব্যক্তি আফ্রিকার দেশ গিনির নাগরিক হামদু (ছদ্মনাম)৷ যিনি দীর্ঘদিন ধরে এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ্য অবস্থায় আটক আছেন৷ এনজিওগুলো দ্রুত এই অভিবাসীর মুক্তি ও বহিষ্কারাদেশ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে৷

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ছয়টি প্রশাসনিক আটককেন্দ্র ও বিমানবন্দরগুলোতে অবস্থিত তিনটি অস্থায়ী অপেক্ষা কেন্দ্রের পাশাপাশি উত্তর ফ্রান্সের ‘তুর্কুয়া’ শহরে একটি আটক কেন্দ্র রয়েছে। 

এরমধ্যে প্যারিস অঞ্চলের ভাঁসেন সিআরএ কেন্দ্রটিতে বর্তমানে আটক আছেন এইচআইভি-পজিটিভ ও বহিষ্কারের ঝুঁকিতে থাকা আফ্রিকান অভিবাসী হামদু (ছদ্মনাম)৷ 

সাধারণত ফ্রান্স ত্যাগের নির্দেশে পাওয়া কোন অভিবাসী যদি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দেশত্যাগ না করেন তাহলে আইনিভাবে সেসব অভিবাসীকে এসকল আটককেন্দ্র বা সিআরএ’তে রাখা হয়৷ 

পড়ুন>>উত্তর ফ্রান্সে ভুল নীতির শিকার ‘অভিবাসীরা’

এছাড়া ডাবলিন বিধিভুক্ত আশ্রয়প্রার্থীকে তাদের প্রথম আঙুলের ছাপ দেয়া দেশে ফিরে যাওয়ার নোটিশ দিলে কর্তৃপক্ষ চাইলে স্থানান্তরের আগে তাদেরকে এসব কেন্দ্রে আটক রাখতে পারেন৷

১৫ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, চার ফরাসি সংসদ সদস্য সন্দ্রিন রুশো (সবুজ দল ), দানিয়েল সিমোনে (লা ফ্রন্সঁ আনসুমিজ), রেমন্দ পনসে (সবুজ দল) এবং অ্যান্ডি কেরব্রের (লা ফ্রন্সঁ আনসুমিজ) এই আটককেন্দ্রটি সফর করেন৷ তাদের সঙ্গে ছিলেন ইনফোমাইগ্রেন্টস প্রতিনিধিও৷ 


আটককেন্দ্র সফরের সময় সংসদ সদস্যরা অভিবাসীদের কক্ষগুলো পরিদর্শন করা শুরু করলে সেখানে বন্দি এক অভিবাসী প্রতিনিধি দলকে বলেন, “আসুন এবং দয়া করে এখানকার পরিস্থিতি দেখুন।”

তিনি তার শোবার জায়গা সরিয়ে মেঝেতে থাকা শুকনো রক্তের দাগ এবং তার পাশে থাকা আরেক অসুস্থ্য অভিবাসীকে দেখান৷ তিনি জানান, “এই কক্ষে এখন আমার সাথে শুধু একজন রয়েছেন৷ তবে বেশিরভাগ সময় একটি কক্ষে চার থেকে পাঁচজন রাখা হয়৷’’ 

প্রথম অভিবাসী যাকে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন৷ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি তীব্র জ্বরে ভুগছেন এবং বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ৷

প্রতিনিধি দলকে দেখে তিনি বলেন, ‘‘আমি বুঝতে পারছি না, আমি কেন এখানে৷ ১৫ দিন ধরে এখানে থেকে আমার ওজন কমে গেছে৷ অসুস্থ্য হয়ে আমি আটককেন্দ্রের মেডিক্যাল সেন্টারে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু আমাকে শুধু ডইফ্রান বা প্যারাসিটেমল দেয়া হয়৷’’

তবে আটককেন্দ্রের বন্দিদের সবার নজর অন্য এক যুবকের দিকে৷ তিনি ফরাসি ভূখন্ড থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে থাকা সেই এইচআইভি-পজিটিভ অভিবাসী হামদু৷ তিনি চার সংসদ সদস্য ও সংবাদকর্মীদের কাছে তার চিকিৎসার নথি বের করে দেখান৷ বলেন, “আমি আগে নিয়মিত হাসপাতালে যেতাম৷ কিন্তু এখানে কোন ডাক্তার নেই তাই যেতে পারি না৷ গতকাল কাশির সাথে রক্ত গিয়েছিল৷’’

আরও পড়ুন>>ফ্রান্সে নতুন আটককেন্দ্র: অভিবাসন সংস্থাগুলোর নিন্দা

আটককেন্দ্রের অন্য অভিবাসীদের সবার মুখেও ক্লান্তির ছাপ৷ তারা অনেক কিছু বলতে চাইলেও সেগুলো স্পষ্ট বোঝার আগেই আটককেন্দ্রের আইন অনুযায়ী পুলিশ দরজা বন্ধ করে দেয়৷

এনজিও ও অভিবাসন সংস্থাগুলোর প্রতিবাদ 

এইচআইভি-পজিটিভ গিনির এই অভিবাসীকে তার দেশে ফেরত পাঠালে সেখানে তার মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ওডিএসই, অ্যাক্ট-আপ প্যারিস, কমেড এবং মেদসাঁ দ্যু মোন্দ সহ বেশ কয়েকটি অভিবাসন সংস্থা ও এনজিও৷ 

দ্য অবজারভেটরি অফ দ্য রাইট টু হেলথ অফ ফরেনার্স (ওডিএসই) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘‘এই ভুক্তভোগী কোন প্রকার চিকিৎসা সুবিধা ছাড়াই ১৭ আগস্ট থেকে প্যারিসের ভাঁসেন সিআরএ-তে আটক আছেন৷ তিনি তার এইচআইভি রোগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঝুঁকিতে আছেন এবং গিনিতে ফেরত পাঠালে তার স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতি ঘটবে৷ কারণ সেখানে এইচআইভির উন্নত চিকিৎসা নেই৷’’

তবে, এই অভিবাসীকে বহিষ্কার আদেশ পুনঃবিবেচনার দায়িত্বে থাকা ফরাসি ইমিগ্রেশন ও ইন্টিগ্রেশন বিষয়ক দপ্তরের (অফি) দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক বিপরীত সিদ্ধান্ত দিয়েছে৷ 

অফির মতে, গিনি কোনাক্রিতে এইচআইভির চিকিৎসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে৷ এই মতামতের কারণেই আটক ব্যক্তি এখন বহিষ্কারের হুমকিতে রয়েছেন৷ 

পড়ুন>>ফ্রান্সে ডিটেনশন সেন্টারের পরিবেশ ‘অমানবিক’

২৫ বছর ধরে অভিবাসীদের স্বাস্থ্য সেবাদানকারী এনজিও কমেড মেডিক্যাল সেন্টারের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন ডাক্তার অলিভিয়ের লেফেব্র৷ 

তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ‘‘আমি প্রথমবারের মতো একজন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে অফি থেকে একটি নেতিবাচক রায় পেতে দেখলাম৷ এই অভিবাসী প্রকৃতপক্ষে উচ্চ পর্যায়ের ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং তার স্বাস্থ্যের অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে৷ গিনিতে কোনোভাবেই এ জাতীয় রোগীর সর্বোচ্চ চিকিৎসা সম্ভব নয়৷’’

ফ্রান্সে, ২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত অনিয়মিত বিদেশিদের বহিষ্কারের নিয়মে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে৷ আগে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে থাকা বিদেশিদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রতিবেদন প্রদানের দায়িত্বে ছিল আঞ্চলিক স্বাস্থ্য অধিপপ্তরের (এআরএস)।

২০১৭ সাল থেকে এই দায়িত্ব দেয়া হয় ফরাসি ইমিগ্রেশন ও ইন্টিগ্রেশন বিষয়ক দপ্তর (অফি) এর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের। যারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় চুক্তিবদ্ধ থাকবেন বলে জানানো হয়৷ 

অলিভিয়ার লেফেব্রের মতে, নতুন করে অফিকে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই বহিষ্কারের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের মতামতের সংখ্যায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷

অভিবাসন সংস্থা এসওএস সলিদারিতে আটককেন্দ্রগুলোতে অনিয়মিত অভিবাসীদের আইনি সহায়তা প্রদান করে৷ এই সংস্থার রিটেনশন সার্ভিসের প্রধান মাথিল্ড বুফিয়ের বলেন, প্যারিসের ভাঁসেন সিআরএ তে আটক অভিবাসীদের ক্ষেত্রে অফির চিকিৎসকদের প্রদান করা বেশিরভাগ মতামত নেতিবাচক।

পড়ুন>>ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসী পরিবহণের দায়ে এক পাচারকারীর ১৮ মাসের কারাদণ্ড

তিনি আরও বলেন, “প্যারিসের এই আটককেন্দ্রের অভিবাসীদের লক্ষ্য করে দেওয়া সিদ্ধান্তগুলো স্বেচ্ছাচারিতার স্পষ্ট উদাহরণ৷ কারণ এর আগে আমরা উত্তর ফ্রান্সের একটি আটককেন্দ্রে থাকা একজন এইচআইভি আক্রান্ত অভিবাসীর বহিষ্কারের বিরুদ্ধে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পেয়েছিলাম৷’’ 

প্রশ্নবিদ্ধ ২০১৭ সালের ডিক্রি

গিনির অভিবাসী হামদুর বহিষ্কারাদেশ ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর যৌথ ভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে ফরাসি সংসদের বেশ কয়েকজন সাংসদ এবং অভিবাসন সংস্থাগুলো৷ তবে এখনও পর্যন্ত, মন্ত্রণালয় কোন উত্তর দেয় নি৷ 

সংশ্লিষ্টরা মন্ত্রণালয়কে অসুস্থ্য বিদেশিদের বহিষ্কারের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি জারি হওয়া ডিক্রিটি সঠিকভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে৷ ডিক্রিতে অফির চিকিৎসকদের কার্যবিধি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে৷  

এনজিও অ্যাক্ট-আপ প্যারিসের অ্যাডভোকেসি অফিসার ফ্রঁসোয়া এমিলি ব্যাখ্যা করেন,

এই ডিক্রিতে অসুস্থ্যতার আবেদন যাচাইয়ের দায়িত্ব স্থানীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অফিতে স্থানান্তর করা হয়েছে৷ সেই সাথে এটি স্পষ্টভাবে এইচআইভি রোগীদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও প্রদান করে৷’

তার মতে, ‘‘ডিক্রি অনুযায়ী সবগুলো উন্নয়নশীল দেশে এখনও এইচআইভি-পজিটিভ ব্যক্তিদের অ্যান্টিরেট্রো ভাইরাল চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সেবাপ্রাপ্তি এখনও সম্ভব নয়, যা প্যারিস-ভাঁসেন আটককেন্দ্রে বন্দি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অফির চিকিৎসকদের প্রদান করা সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক৷’’ 



এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন