সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রশাসনিক আদালতের সামনে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীরা৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম
সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রশাসনিক আদালতের সামনে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীরা৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম

ইউরোপে মানবপাচারের অভিযোগে বাংলাদেশের কুমিল্লা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন-র‍্যাব৷ এই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে সাইপ্রাসেও৷

আটককৃতরা হলেন সোহেল মজুমদার বা মো. হাবিবুর রহমান, মো. জাকির হোসেন ও কাজী আবু নোমান৷ রোববার রাতে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার জাঙ্গালিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে৷ 

র‌্যাব-১১ এর সিপিসি টু এর কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন জানান, ১০ সেপ্টেম্বর একজন ভুক্তভোগীর ভাইয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়৷ অভিযোগ অনুযায়ী, দুলাল নামের এক ব্যক্তির পরিবারকে জাকির ও নোমান বোঝান যে, তাদের মাধ্যমে সাইপ্রাস গেলে প্রচুর টাকা উপার্জন করা যাবে৷ তারা জানান, সোহেল বা হাবিবুর রহমান নামের তাদের একজন সাইপ্রাসে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন এবং তার মাধ্যমে সাইপ্রাসে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে৷ এজন্য ভিসা প্রক্রিয়ার নামে প্রথমে দুই লাখ, ফ্লাইটের জন্য পরে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দেয় দুলালের পরিবার৷ এর আট মাস পর তাকে দুবাই নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে ছয় মাস আটকে থেকে এই চক্রকে আরো চার লাখ টাকা দিয়েও সাইপ্রাসে যেতে পারেননি তিনি৷ এমন অবস্থায় চক্রটি তাদের কাছে আরো তিন লাখ টাকা দাবি করার পর দুলালের পরিবার র‌্যাবের কাছে অভিযোগ দায়ের করে৷ 

ইনফোমাইগ্রেন্টসকে মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন,

শুধু সাইপ্রাসে নিয়ে যাওয়া নয়, সাইপ্রাস থেকে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার জন্যও এই চক্র কাজ করছে৷ দেশের ভিতরেও আমরা আরো কিছু তথ্য পেয়েছি৷ যেমন সনদ তৈরি করে দেয়ার ব্যাপারে৷ কেউ হয়ত শিক্ষার্থী নন, কিন্তু তার একটি সনদ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে৷ সেটি কোথায় পাওয়া যাচ্ছে? এসব নকল নথি যারা তৈরি করে বা যারা পর্যটন ভিসায় দুবাই নিয়ে ফেলে রাখে তাদের আরেকটা চক্র আছে যাদের আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসিনি৷ কিন্তু এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা দ্রুতই তাদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসব৷

বর্তমানে তিনজনের বিরুদ্ধেই মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছে বলে জানান মেজর সাকিব হোসেন৷ 

 

পড়ুন: বৈধ প্রক্রিয়ায় উত্তর সাইপ্রাসে যেমন আছেন বাংলাদেশিরা 

অভিযোগ সাইপ্রাসেও

সাইপ্রাস ভূখণ্ডটি দুইটি অংশে বিভক্ত৷ একটি তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত টার্কিশ রিপাবলিক অব নর্থ সাইপ্রাস, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়৷ অন্যটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত গ্রিক ভাষাভাষী সাইপ্রাস রিপাবলিক৷

ঢাকা থেকে দুবাই, সেখান থেকে তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত টার্কিশ রিপাবলিক অব নর্দার্ন সাইপ্রাসে বাংলাদেশিদের পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের৷ পাচারকারীরা এরপর তাদের অনিয়মিত উপায়ে সাইপ্রাস রিপাবলিকে পাঠিয়ে থাকেন৷ গত জুনে ডয়চে ভেলের দুই সংবাদকর্মী সাইপ্রাসের এই দুই অংশে গিয়ে সরেজমিন একাধিক প্রতিবেদন করেন৷ সেখানে অনিয়মিতভাবে আসা অনেক বাংলাদেশির কাছেই পরিচিত সোহেল মজুমদার, পাসপোর্ট অনুযায়ী যার নাম হাবিবুর রহমান বলে জানিয়েছে র‌্যাব৷ 

ইনফোমাইগ্রেন্টসের কাছে তার হাতে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন বর্তমানেসাইপ্রাসের লিমাসলে বসবাস করা বাংলাদেশের ইকবাল জামশেদ৷

পড়ুন: সাইপ্রাসের শরণার্থী শিবিরে বাংলাদেশিদের ঠাঁই যেভাবে

২০১৬ সালে তিনি আসেন নর্দার্ন সাইপ্রাসে৷ ইকবাল জানান, সেসময় সোহেল মজুমদার সেখানেই থাকতেন এবং অনিয়মিত বাংলাদেশিদের নিয়মিত করার জন্য চুক্তিভিত্তিক বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন৷ ২০২১ সালে ইকবালের কাছ থেকে এজন্য পাঁচ হাজার ইউরো বা প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নেন৷ তিনি বলেন, ‘‘৫০-৬০ জনের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে সোহেল এক পর্যায়ে বাংলাদেশে চলে যান৷ এই কাজে তার আরেক ভাই শরীফ তাকে সহায়তা করতেন যিনি সাইপ্রাস রিপাবলিকে বসবাস করতেন৷ তিনিও কারো টাকা ফেরত না দিয়ে পর্তুগালে পালিয়ে যান৷’’ 

এদিকে সাইপ্রাসের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও বাংলাদেশের মো. হাবিবুর রহমানের নামে অভিযোগ রয়েছে৷ ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বরে দেশটির ইংরেজি গণমাধ্যম সাইপ্রাস মেইলে ছবিসহ প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, অর্থপাচার, প্রতারণাসহ তার বিরুদ্ধে আট ধরনের অভিযোগ রয়েছে৷ একারণে পুলিশ তার সন্ধান করছে৷ ইকবাল জানান, সেসময় গ্রেপ্তার এড়াতেই নর্দার্ন সাইপ্রাসে চলে আসেন তিনি৷ পরে সেখান থেকে অভিবাসীদের টাকা হাতিয়ে বাংলাদেশে চলে যান৷

মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেনও জানান তাকে গ্রেপ্তারের পর এখন পর্যন্ত ২০-২৫ জনের কাছ থেকে তারা অভিযোগ পেয়েছেন৷

এফএস/এডিকে

পড়ুন: উত্তর সাইপ্রাসে অনিয়মিত অভিবাসনে সহায়তার দায়ে আটক দুই বাংলাদেশি

 

অন্যান্য প্রতিবেদন