ইজমিরের একটি বাস স্টেশনে অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: পিকচার এলায়েন্স।
ইজমিরের একটি বাস স্টেশনে অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: পিকচার এলায়েন্স।

তুর্কি সংবাদ মাধ্যম গাজেটে ডুভার জানিয়েছে, গ্রিস থেকে পুশব্যাকের শিকার হয়ে উপকূলে ফিরে আসা অভিবাসীদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের আগে তুরস্কের পশ্চিমে ইজমির প্রদেশে অবস্থিত একটি নাজুক ভবনে অমানবিক পরিস্থিতিতে আটক রাখা হয়।

তুরস্ক থেকে গ্রিক উপকূলে যাত্রা করা অভিবাসীদের জন্য ইজমির দিনদিন একটি জনপ্রিয় স্থান হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক অভিবাসীকেই পুশব্যাক করে তুরস্কে ফেরত পাঠাচ্ছে গ্রিস

বর্তমানে যেসব অভিবাসীরা গ্রিক উপকূল থেকে নিরাপদে তুরস্কের ইজমির প্রদেশে ফিরে আসছেন তাদেরকে ইজমিরে নগর কর্তৃপক্ষের একটি ভবনে আটক রাখা হচ্ছে। সেখানে অভিবাসীদের সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত আটক রাখার অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুন>>ব্যক্তিগত বিমানে তুরস্ক থেকে ইউরোপে মানবপাচার

এই সময়ের পর, আটককৃতদের বেশিরভাগকে একটি প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয় যেখান থেকে অভিবাসীদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

শীতের জন্য অনুপযুক্ত দালান

জানা গেছে, ইজমিরের এই ভবনটিতে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা শতাধিক৷ তাদেরকে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন কক্ষে রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ শরণার্থী নারী ও শিশু এবং তাদের জন্য সেখানে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও নেই। ইজমির নগর কর্তৃপক্ষ আটক অভিবাসীদের জন্য নিয়মিত স্যান্ডউইচ সরবরাহ করার কথা জানালেও অভিবাসীদের অভিযোগ তাদের কোন প্রকার গরম খাবার ও অন্য কোন পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয় না। 

তুরস্কের ইজমির প্রদেশে একদল আফগান শরণার্থী। সম্প্রতি তুরস্কে অভিবাসীদের প্রতি স্থানীয় নাগরিকদের বিরুপ মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ছবি: Uygar Ozel/Imago
তুরস্কের ইজমির প্রদেশে একদল আফগান শরণার্থী। সম্প্রতি তুরস্কে অভিবাসীদের প্রতি স্থানীয় নাগরিকদের বিরুপ মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ছবি: Uygar Ozel/Imago


পুশব্যকের পর ভবনটিতে রাখা অভিবাসীরা জানালার পাশ দিয়ে ভবনের বাইরে হেঁটে যাওয়া পথচারীদের ডেকে খাবার চান বলেও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।

পড়ুন>>তুর্কি শিক্ষার্থীদের ইউরোপে যেতে তুরস্ক সরকারের বাধা

গাজেটে ডুভারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক প্রহরী বলেন, “বন্দিরা খুব আরামদায়ক অবস্থায় থাকুক এটি কর্তৃপক্ষ কখনও চায় না। কখনও কখনও এই ভবনে একই সঙ্গে ৩৫০ জন পর্যন্ত বন্দিকে রাখা হয়৷”

তিনি আরও জানান, “আমরা তাদেরকে আসার পরে একটি কম্বল এবং খাবার দিই। আমরা প্রয়োজনের বেশি না দেওয়ার চেষ্টা করি কারণ এতে আরাম পেলে তারা কখনই তুরস্কে ছেড়ে যেতে চাইবে না।”

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রহরী আরও ইঙ্গিত করেন, বন্দিরা যাতে এখানে অস্বস্তি বোধ করেন, সেজন্য মাঝেমধ্যে তাদের মারধরও করা হয়।

অভিবাসীদের রাখার জন্য নির্ধারিত এই ভবনের আশেপাশে বসবাসরত স্থানীয় বাসিন্দারা গণমাধ্যমকে জানান, শরণার্থীদের অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখার বিষয়টি তারাও লক্ষ্য করেছেন। তারা আরও জানান, বাইরে থেকে জানালা দিয়ে ভবনের টয়লেটগুলোতে সবসময় উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় এবং দালানটি শীতের জন্য অনুপযুক্ত।

ভবনের পাশ্ববর্তী একজন রেস্তোরাঁ মালিক গাজেটে ডুভারের সাংবাদিকদের জানান, “শীত শুরু হলে এই ভবনে অবস্থানরত অভিবাসীদের বাচ্চাদের কী হবে, আমা সে কথা ভাবি। তারা কিভাবে এই অবস্থা সহ্য করবে? শহরের মাঝখানে এই পরিস্থিতিতে অভিবাসীদের রাখা সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি।”

আরও পড়ুন>>আফগান শরণার্থীদের ‘ঢুকতে দিচ্ছে না’ ইরান ও তুরস্ক

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “অনেক নাগরিক অভিবাসীদের গরম খাবার এবং অতিরিক্ত কম্বল দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিল কিন্তু পুলিশ তাদেরকে বাধা দিয়েছে। আমরা বর্তমানে এখানে একটি মানবেতর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি। কর্তৃপক্ষের উচিৎ অবিলম্বে এই পরিস্থিতির সমাধান করা।” 

আইনজীবী নিয়োগের অধিকার খর্ব

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা আইনজীবী গিজেম মেটিন্ডাগ বলেন, এখানে কমপক্ষে ২৫ জন নাবালককে প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধান ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। নাবালকদের প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে একই কাঠামোতে রাখা বেআইনী৷

তিনি আরও যোগ করেন, “পুশব্যাক হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের কোন প্রকার আইনজীবী নিয়োগের অধিকার ছাড়াই সেখানে রাখা হয়েছে। তারা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন প্রকার আপিল করতে পারবেন না। এছাড়া, সংবিধান অনুযায়ী আটকের প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও দুই সপ্তাহ পর্যন্ত অনেককে বন্দি রাখা হচ্ছে। এটা শরণার্থী ও আশ্রয় অধিকারের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।”

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এনজিও গ্লোবাল ডিটেনশন প্রজেক্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা তুরস্কের প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা নিয়ে বারবার সমালোচনা করেছেন। পর্যবেক্ষকরা তুর্কি আটক কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ রাখা, চিকিৎসার অভাব, আইনজীবী ও অধিকার সংগঠনগুলোর প্রবেশে সুবিধা এবং নাবালকদের প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে আটক রাখার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

পড়ুন>>গ্রিসের পুশব্যাকের সাম্প্রতিক ড্রোন ফুটেজ রয়েছে: তুরস্ক

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আটক অভিবাসীরা যদি কেন্দ্রগুলোতে নির্দিষ্ট নিয়ম এবং অনুশীলনের প্রতিবাদ করে, তবে প্রায়শই নিরাপত্তা কর্মীরা তাদের দুর্ব্যবহার করেন এবং মারধর করা হয়।

স্টকহোম সেন্টার ফর ফ্রিডমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য টিনেকে স্ট্রিক বলেছেন, “তুরস্ককে কোন ভাবেই অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নিরাপদ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তুরস্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আইনি সমস্যা হল যে এটি অ-ইউরোপীয় শরণার্থীদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন মানতে বাধ্য নয়।”


এমএইউ/এডিকে




 

অন্যান্য প্রতিবেদন