সিসিলির কাম্পোবেলো ডি মাজারা আশ্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশি অভিবাসীরা৷ ছবি. এমা ওয়ালিস
সিসিলির কাম্পোবেলো ডি মাজারা আশ্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশি অভিবাসীরা৷ ছবি. এমা ওয়ালিস

বিভিন্ন কারণে পাসপোর্টে দেয়া বয়সের তথ্য পরিবর্তন করতে চান ইটালিতে আসা অনিয়মিত বাংলাদেশিরা৷ সেই সুযোগ না পাওয়ায় বসবাসের বৈধতা ও কাজের সুযোগ কোনটাই মিলছে না৷

ইটালির সিসিলির রাজধানী পালেরমো থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরের শহর কাম্পোবেলো ডি মাজারা৷ সেখানে দুইতলা একটি শরণার্থী ক্যাম্পে থাকেন কয়েকজন বাংলাদেশি৷ তাদের একজন মো. সজীব হোসেন বছরখানেক আগে দ্বীপটিতে এসে পৌঁছান৷ 

বাংলাদেশ থেকে প্রথমে তিনি আসেন দুবাই৷ সেখানে এক সপ্তাহ থেকে চলে যান লিবিয়ায়৷ উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে তিনি দুই মাস কাজ করেন বিনা বেতনে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি দুই মাস ছিলাম, আমাকে কোনো টাকা পয়সা দেয় নাই৷ আমাকে মেরে ফেলে রেখে যায় ওরা৷ পরে সেখানে বাঙ্গালিরা আমাকে সুস্থ করে তোলে৷ পরে বাড়ি থেকে টাকা এনে আমি সাগরপথে ইটালি আসি৷’’

বিপজ্জনক এই যাত্রায় প্রায় দশ লাখ টাকার মতো খরচ করে সজীব এখন আটকে আছেন শরণার্থী ক্যাম্পে৷ অনিয়মিত পথে আসা এই বাংলাদেশি দেশটিতে আশ্রয় আবেদনও করতে পারছেন না৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি আসার পথে পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছি৷ এখানকার কর্তৃপক্ষ আমার কাছে পাসপোর্ট চাইছে৷ কিন্তু আমি কোথা থেকে দিব? বাংলাদেশ দূতাবাস আমাদের পাসপোর্ট দিচ্ছে না৷’’


পড়ুন: ইটালির আশ্রয়প্রার্থীদের যা যা জানা উচিত

১১ বছরের গরমিল! 

সজীব জানান, তার পাসপোর্টের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধনের বয়সের পাঁচ বছরের বেশি গরমিল৷ এখন তিনি বয়স কমিয়ে প্রকৃত বয়স দেখিয়ে পাসপোর্ট করতে চান৷ কিন্তু সেই সুযোগ পাচ্ছেন না৷

শুধু সজীব নন, ইটালিতে এখন এমন সমস্যায় অনেক অনিয়মিত বাংলাদেশি৷ ইনফোমাইগ্রেন্টস ও ডয়চে ভেলের দুই সংবাদকর্মী আরাফাতুল ইসলাম ও এমা ওয়ালিসের কাছে এই সমস্যার কথা তুলে ধরেন বেশ কয়েকজন৷ 

কাম্পোবেলো ডি মাজারায় শরণার্থী ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা মামুন বলেন, ‘‘আমরা কাজ করতে গেলে ডকুমেন্ট লাগে৷ আমাদের কাছে পাসপোর্ট চাইছে কিন্তু পাসপোর্ট দিতে পারছি না৷’’ এই অভিবাসীর পাসপোর্টে বয়সের গরমিল ১১ বছরের৷ তিনি জানান, ১৬-১৭ বছর বয়সে তিনি কাজের জন্য সৌদি আরবে যেতে বয়স বেশি দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করেছিলেন৷ সৌদি আরব যেতে না পেরে একসময় তিনি লিবিয়া হয়ে ইটালি পাড়ি জমান৷ এখন প্রকৃত বয়সের তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট করতে চাইলেও তিনি সেটা করতে পারছেন না৷

কাম্পোবেলো ডি মাজারায় শরণার্থী ক্যাম্পটিতেই স্বচ্ছন্দে আছেন অভিবাসীরা৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম
কাম্পোবেলো ডি মাজারায় শরণার্থী ক্যাম্পটিতেই স্বচ্ছন্দে আছেন অভিবাসীরা৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম

আরামে থাকলেও স্বস্তিতে নেই

কাম্পোবেলো ডি মাজারার শরণার্থী ক্যাম্পটি বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন৷ দুই তলা ভবনটিতে ভালোভাবে থাকার জন্য তেমন কিছুর ঘাটতি নেই৷ বাসিন্দাদেরও কোনো অভিযোগ নেই৷ মোহাম্মদ রাকিব হাওলাদার নামে একজন বলেন, ‘‘আমরা সব দিক থেকেই এখানে ভালো আছি৷ আমাদের তালিকা অনুযায়ীই এখানে বাংলাদেশি খাবার কিনে দেয়া হয়৷’’ তারপরও তাদের মনে স্বস্তি নেই৷

এই ক্যাম্পের বাসিন্দাদের প্রত্যেকেই লিবিয়া থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছেন৷ রাকিব বলেন, ‘‘আমি লিবিয়া থেকে এসেছি দুই বছর হলো৷ লিবিয়ায় পাঁচ মাস কাজ করেছি, কিন্তু আমাকে কোনো টাকা দেয়া হয়নি৷ সেখানে যুদ্ধ চলছে৷ আমি যে ভবনে ছিলাম সেখানেও গুলি করা হয়েছে৷ দেশেও তো অনেক ঝামেলা৷ এই কারণেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে আসতে বাধ্য হই৷ দুই বছর পর আমার কাগজ নবায়ন করতে হবে৷ পাসপোর্ট না পেলে সেটি বাদ হয়ে যাবে৷’’

এদিকে পাসপোর্টের কারণে এই অভিবাসীরা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাজ করতে পারছেন না বলে জানান৷ ২০১৩ সালে ইটালিতে আসা মো. সাইফুল ইসলাম জানান শহরটিতে অলিভ খামারে মৌসুমে কৃষিকাজের পাশাপাশি বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে অভিবাসীদের কাজের সুযোগ রয়েছে৷ কাগজ থাকায় তিনি নিজেও কাজ করেন সেখানে৷ মৌসুমে শুধু অলিভ খামারে মাসে অন্তত দুই হাজার ইউরোর আয় করতে পারেন অভিবাসীরা৷ কিন্তু পাসপোর্টের অভাবে অনুমতি না থাকায় এই কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না অনিয়মিত বাংলাদেশিরা৷ 

বাংলাদেশ থেকে আনা জন্মসনদে উল্লেখিত বয়স দিয়ে নতুন পাসপোর্ট দেওয়ার দাবিতে সম্প্রতি ইটালির রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভও করেছেন প্রবাসীরা৷ 

পড়ুন: ইটালিতে বসবাসের অনুমতিতে বাংলাদেশিরা চতুর্থ

এফএস/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন