২০১৬ সালে দক্ষিণ ইটালির ক্যামিনি শহরে আসেন ৪৩ বছর বয়সি সিরীয় শরণার্থী আমাল আহমেদ ওকলা। ছবি; ইনফোমাইগ্রেন্টস
২০১৬ সালে দক্ষিণ ইটালির ক্যামিনি শহরে আসেন ৪৩ বছর বয়সি সিরীয় শরণার্থী আমাল আহমেদ ওকলা। ছবি; ইনফোমাইগ্রেন্টস

ইটালির ক্যালাব্রিয়া অঞ্চলের ছোট্ট শহর ‘ক্যামিনি’৷ দক্ষিণ ইটালির এই ছোট বিচ্ছিন্ন শহরে বাস করেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসা প্রায় ১৫০ জন অভিবাসী৷ নতুন অভিবাসীদের কারণে শহরটি আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে বলে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা৷ সেখানকার চিত্র তুলে ধরছেন ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশেষ সংবাদদাতা শার্লত ওবেরতি৷

আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে কেমন ছিল দক্ষিণ ইটালির ক্যামিনি শহরের বাসিন্দাদের পরিবেশ সেটি কল্পনা করতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সে সময়ের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে৷ অবশ্য তখন এটি শহর না বরং গ্রাম ছিল৷ এখনও পরিবেশ অনেকটাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মতোই৷ 

স্থানীয়রা জানান, সে সময় বেশ প্রাণবন্ত এবং কোলাহলপূর্ণ ছিল ক্যামিনির পরিবেশ ও জীবনযাত্রা৷ বাসিন্দারা আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন৷ সে সময় ক্যামিনিতে মোট তিনটি বার ও ক্যাফে ছিল৷ 

ক্যামিনি ক্যালাব্রিয়ার এমন একটি শহর যেখানে সমুদ্রে তীরে দাঁড়িয়ে থাকা জলপাই গাছের সারি আর পাহাড়ি উপত্যকা এক হয়েছে৷ কিন্তু ক্যামিনির হৃদয় এখন দুঃখে ভরা৷ 


নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ক্যামিনি শহরের উপত্যকায় জলপাই গাছের সারি।  ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ক্যামিনি শহরের উপত্যকায় জলপাই গাছের সারি। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে শহরের মেয়রের কার্যালয় বা টাউন হলের উপকণ্ঠে তৈরি করা চত্ত্বরটি প্রায় ফাঁকা৷ পাশেই একটি বেওয়ারিশ কুকুর ঘেউ ঘেউ শব্দে ছুটে চলেছে৷  

নব্বই-এর দশকে এই শহরের অনেক বাসিন্দা চাকরির সন্ধানে ইটালির অন্যত্র চলে যান৷ বর্তমানে এই শহরের দুটি বিভক্ত অংশে মোট ৮০০ জন বসবাস করছেন যার একটি অংশ সমুদ্রের কাছে অপরটি পাহাড়ের উপরে৷ 

দক্ষিণ ইটালির এই দরিদ্র অঞ্চলে চাকরির অভাবকে দায়ী করছেন বাসিন্দারা৷ অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ক্যামিনি পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্য সংগ্রাম করছে৷

 বারবার বাসিন্দারা শহর ত্যাগ করায় ক্যামিনি হারিয়েছিল প্রাণ৷ তবে এখন নতুন করে আবারও জীবন ফিরতে শুরু করেছে সাগর তীরের এই জনপদে৷

বর্তমানে নতুন করে একটি রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছে যেটি একই সাথে একটি বার ও ক্যাফে৷ শহরের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে আরও চারটি ক্লাস চালু হয়েছে, যেখানে ২০ বছর ধরে শুধু একটি ক্লাস ছিল৷ এছাড়া ২০২০ সাল থেকে কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলনের জন্য একটি এটিএমও চালু হয়েছে৷


শহরের একজন বয়স্ক বাসিন্দার খোঁজ নিচ্ছেন সমবায় সমিতি ইউরোকুপ কামিনির সহ প্রতিষ্টাতা রোজারিও জুরজোলো। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
শহরের একজন বয়স্ক বাসিন্দার খোঁজ নিচ্ছেন সমবায় সমিতি ইউরোকুপ কামিনির সহ প্রতিষ্টাতা রোজারিও জুরজোলো। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


শহরের স্থানীয় বাসিন্দা ৪৫ বছরের রোজারিও জুরজোলো ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ‘‘এখন শহরে যা কিছু আছে সবই অভিবাসীদের সাথে যুক্ত৷’’

রোজারিওর বয়স যখন বিশের কাছাকাছি তখন তাকে কাজ খুঁজতে জন্মভূমি ছেড়ে যেতে হয়েছিল৷ বেশ কয়েক বছর পর ১৯৯৯ সালে তিনি ক্যামিনিতে ফিরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইউরোকুপ ক্যামিনি নামে একটি সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন৷

তবে পরিস্থিতি পাল্টে যায় ২০১৬ সালে৷ সে সময় শহর কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের আশ্রয় সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নিয়ে জিতেছিল৷ এই প্রকল্প অনুসারে, অভিবাসন সংস্থা ইউরোকুপ ক্যামিনি একজন অভিবাসীর জন্য দৈনিক ৩৫ ইউরো পান৷ এই অর্থ দিয়ে আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীরা তাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারেন৷

বর্তমানে ক্যামিনিতে আফগানিস্তান, মরক্কো, টিউনিশিয়া, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া ও সিরিয়া থেকে আসা প্রায় ১৫০ জন অভিবাসী বসবাস করছেন৷ 

অভিবাসীদের উপস্থিতির কারণে বিভিন্ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শহরের কর্মসংস্থান আয়ে ভূমিকা রাখছে৷ বর্তমানে ইউরোকুপ ক্যামিনি সমবায় সমিতিতে ১৮ জন কাজ করছেন৷ এছাড়া সমবায়টির মাধ্যমে ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা বা দোকান চালু করা হয়েছে৷ সিরামিক, কাঠ, পোশাকের দোকানে শরণার্থীরা কাজ করছেন৷ 

শহরের রাস্তায় হিজাব পরিহিত অভিবাসী নারীদের ও তাদের শিশুদের হাঁটতে দেখা যায়৷ চোখে পড়ে তাদের বাড়ির সিঁড়িতে বসে আড্ডা দেয়া বয়স্ক ইটালীয়দেরও৷

শহরের বাসিন্দাদের কারও আসা কিংবা যাওয়া রোজারিও জুরজোলোর নজর এড়িয়ে যায় না৷ সবাইকে ইটালীয় ভাষায় Ciao! বা চাও বলে বিদায় জানান তিনি৷ 

ইনফোমাইগ্রেন্টসকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এখানে এক ধরনের চক্রাকার অর্থনীতি গড়ে তুলেছি৷ আপনি এখানে যাদের সাথেই দেখা করবেন তাদের বেশিরভাগই আমার কর্মচারী৷’’

‘শহরের প্রথম আরব অভিবাসী’

সিরিয়া থেকে আসা আমাল আহমেদ ওকলা ইনফোমাইগ্রেন্টসের কাছে নিজেকে ক্যামিনির প্রথম আরব অভিবাসী হিসেবে দাবি করেন৷ ২০১৬ সালে পরিবার সহ এখানে আসেন ৪৩ বছরের পাঁচ সন্তানের এই জননী৷ সিরিয়ায় সংঘাতে তার ভাই ও মা একই সময়ে বোমা হামলায় নিহত হন৷ 

২০১৩ সালে দামেস্ক থেকে লেবাননে পালিয়ে যান তিনি৷ তিন বছরের দুর্দশার পর জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) স্থানান্তর কর্মসূচির মাধ্যমে ইটালিতে আসেন তিনি৷ ক্যামিনিতে নতুন জীবন শুরু করেন এই অভিবাসী৷ তিনি জানান, “প্রথমে আমার জন্য এখানে বেশ কঠিন ছিল, বিশেষ করে ভাষাগত বাধার কারণে৷’’


কুটির শিল্পের একটি কারখানায় কাজ করছেন সিরীয় অভিবাসী আমাল আহমেদ ওকলা। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
কুটির শিল্পের একটি কারখানায় কাজ করছেন সিরীয় অভিবাসী আমাল আহমেদ ওকলা। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


অবশ্য পরে ইটালীয় ভাষা ও সমবায় সমিতির একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তাঁতের কাজ শিখে সাবলম্বী হয়ে উঠেন তিনি৷ বর্তমানে শহরের একটি সরু গলির মধ্যে ছোট কার্পেট এবং ব্যাগ তৈরি করেন তিনি৷ যা পাশের দোকানে বিক্রি করা হয়৷ এখানে ক্রেতা খুব কমই, কিন্তু আমাল আহমেদ ওকলা এই কাজের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ ইউরো উপার্জন করেন৷ অবশ্য বিভিন্ন সংস্থার অনুদান এবং রাষ্ট্রীয় সাহায্য থেকে তার বেতনের জন্য ইউরোকুপ ক্যামিনি অর্থ প্রদান করে৷ 

এই ব্যাপারে রোজারিও জুরজোলো বলেন, “আসলে মূল লক্ষ্য হলো এই মানুষদের একটি কার্যক্রমে যুক্ত করা৷ এটি তাদেরকে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল৷’’

ক্যামিনিতে আসার ছয় বছর পর আমাল আহমেদ ওকলা এখন নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করছেন৷ তার মতে, “এখানকার লোকেরা সদয় এবং আমাদের স্বাগত জানায়৷ আমি দেখতে পেয়েছি তাদের মন মানসিকতাও অনেকটা আমাদের আরবদের মতোই৷ কারণ তারা তাদের পরিবারের খুব কাছে থাকে৷ বয়স্করা সবসময় তাদের সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের সাথে থাকে৷’’

তিনি আরও বলেন, “আমার মেয়ে সন্ধ্যায় কোথাও গেলে আমি দুশ্চিন্তা করি না৷ কারণ আমি এখানে নিরাপদ৷ তবে সিরিয়ার অতীত জীবনও আমাকে ভাবায়৷’’

তারপরও তিনি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত৷ কারণ এই শহরে তার নয় থেকে ২১ বছর বয়সি সন্তানদের দেওয়ার মতো কিছুই নেই৷

তিনি বলেন, “এখানে থাকলে শিশুদের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে৷ তারা কোথায় যায় তার উপর আমার ভাগ্য নির্ভর করবে৷ কামিনিতে তারা সারাক্ষণ অভিযোগ করে৷ তারা বিরক্ত হয়৷ যেমন তাদের অভিযোগ আমরা কেন সমুদ্রে যাই না৷ সমুদ্রের কাছাকাছি থাকলেও বেশ লম্বা সময় বাসে করে আমাদের এখান থেকে যেতে হবে৷’’

একটু দূরেই বাবা মায়ের সাথে বসবাস করেন হাসিদ বুখারি৷ যিনি পাকিস্তানের অভিবাসী৷ ২০১৯ সাল থেকে একটি দোকান চালাচ্ছেন তিনি। ১৭ বছর বয়সি এই তরুণের বাবা-মা বিভিন্ন গৃহসামগ্রী তৈরী করেন৷

হাসিদ বুখারি তার পাশে থাকা বাবা মায়ের কথা অনুবাদ করে জানান সাত বছর ধরে থাকার পরও এখানে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি স্থির হতে পারছেন না তারা৷ 

মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের আগে পরিবারটি প্রথম লিবিয়ায় জীবন গড়ার চেষ্টা করে৷ ২০১৪ সালে তারা একটি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালিতে আসেন৷ 


নিজেদের পারিবারিক দোকানে পাকিস্তানি অভিবাসী হাসিদ বুখারি। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
নিজেদের পারিবারিক দোকানে পাকিস্তানি অভিবাসী হাসিদ বুখারি। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


হাসিদ বুখারি বলেন, “আমার বাবা-মা কামিনিকে অত্যন্ত ভালোবাসেন৷ কিন্তু সমস্যা হলো পরিবহণ ব্যবস্থা৷ বসবাসের অনুমতি নবায়ন করতে তাদের নিয়মিত স্থানীয় প্রশাসনিক কেন্দ্রে যেতে হয়৷ তাদের বক্তব্য অনুবাদ করার জন্য আমাকে তাদের সাথে সেখানে যেতে হয়৷ এটি এত দূরে যে আমাকে একদিন স্কুল বাদ দিতে হয়৷’’

এ বছরের ডিসেম্বরে হাসিদ বুখারির ১৮ বছর পূর্ণ হবে৷ তিনি জানান, “প্রথম আমি যা করতে যাচ্ছি তা হলো একটি গাড়ি খুঁজে বের করা৷’’

‘হয়তো একদিন শহরের মেয়রে্র নাম হবে মোহাম্মদ’

একটি চত্বরে বসা পিনো আলফারানো ছোট্ট এই শহরের মেয়র৷ সাদা চুল এবং কব্জিতে ব্রেসলেট পরিহিতি এই ব্যক্তি বলেন, ‘‘সমবায় সমিতিটি মানুষকে আশা দিয়েছে এবং তরুণদের একটি নতুন জীবন দিয়েছে।” তার এলাকার জন্য এই উদ্যোগটি ইতিবাচক যদিও সেখানকার চিত্র এখন অতীতের চেয়ে বেশ আলাদা৷ 


কামিনি শহরের মেয়র পিনো আলফারানো। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
কামিনি শহরের মেয়র পিনো আলফারানো। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


তিনি হেসে বলেন, “এই চত্ত্বরে আগে যারা আসতেন সবাই একই ভাষায় কথা বলতেন৷ এখন এমন মানুষ আসেন যারা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন৷”

রোজারিও জুরজোলো যোগ করেন, ‘‘অভিবাসীরা না থাকলে আমরা কেউ এখানে থাকতাম না৷ সবাই ক্যামিনি ছেড়ে চলে যেত৷ পার্শ্ববর্তী আরেকটি ছোট শহর অভিবাসীদের ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে বেশ সফল হয়েছে৷ রিয়াস নামে এই শহরের মেয়র অভিবাসীদের থাকার জন্য পরিত্যক্ত বিভিন্ন বাড়ির দরজা খুলে দেওয়ার পরে পরিস্থিতি একেবারে পালটে যায়৷’’

তিনি জানান, “অনেকেই আমাদের কার্যক্রমের সমালোচনা করেন৷ কেউ কেউ বলেন যে আমরা ইটালীয়দের চেয়ে অভিবাসীদের জন্য বেশি কাজ করি৷ কিন্তু অনেক ইটালীয়রা সমবায়ভুক্ত হয়ে কমিউনিটিবদ্ধ জীবনে জড়িত হতে চান ন৷’’

মেয়র পিনো আলফারানো মন্তব্য করেন, “আমি এই ধারণা নিয়ে চিন্তিত নই যে আমাদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে৷ এখানে অভিবাসীদের চেয়ে অনেক বেশি ইটালীয় রয়েছে৷ যেসব শিশু ও তরুণরা আসছে তারা স্কুলের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে শিখছে৷ কে জানে, হয়তো একদিন তাদের মধ্যে কেউ একজন নতুন মেয়র হবেন, যার নাম হবে মোহাম্মদ৷ এটা কোন ব্যাপার না৷’’


ক্যামিনি থেকে মূল প্রতিবেদক শার্লত ওবেরতি। ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলায় ভাষান্তর মোহাম্মাদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/আরকেসি














 

অন্যান্য প্রতিবেদন