২০ বছরের ওসমান এবং  ২৬ বছরের মোহসিন বেলগ্রেডের অব্যবহৃত ট্রেন স্টেশনের বাইরে সময় কাটাচ্ছেন৷ দ্রুত বাসে করে দেশের উত্তরাঞ্চলে নিয়ে যাবেন তারা। ক্রেডিট: ইনফোমাইগ্রেন্টস
২০ বছরের ওসমান এবং ২৬ বছরের মোহসিন বেলগ্রেডের অব্যবহৃত ট্রেন স্টেশনের বাইরে সময় কাটাচ্ছেন৷ দ্রুত বাসে করে দেশের উত্তরাঞ্চলে নিয়ে যাবেন তারা। ক্রেডিট: ইনফোমাইগ্রেন্টস

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড বলকান রুটে অনেক অভিবাসীর জন্য একটি সংযোগকারী শহর। যদিও শত শত সিরীয়, আফগান বা মরক্কোর অভিবাসীদের জন্য শুধুমাত্র দুটি আবাসনের বিকল্প রয়েছে। হয় উপচে পড়া ভিড়ে থাকতে হবে, নইলে প্রত্যন্ত এলাকার শিবির কিংবা শহরের রাস্তা বা পার্কে ঠাঁই নিতে হবে।

কাসাব্লাঙ্কার যুবক আশরাফকে দেখেই ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। সিগারেটের ধোঁয়ায় তার মুখ ঢাকা। ছেঁড়া স্নিকারের ফাঁকে মোজা দেখা যাচ্ছে। মরক্কো থেকে অভিবাসী তরুণ পালিয়ে এসেছেন দুই বছর আগে। তুরস্কতে তিন মাস ছিলেন। তারপর বেলগ্রেডে এসেছেন তিন দিন আগে। 

সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে তিনি এবং মরক্কোর আরো তিন অভিবাসী, মোহসেন, ওসমান এবং আমিনের সঙ্গে পুরনো ট্রেন স্টেশনের কংক্রিটের সিঁড়িতে বসেছিলেন। এই স্টেশনটি আগে মূল স্টেশন থাকলেও দীর্ঘদিন এই সিঁড়ি ব্যবহার করেনি কেউ। কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে পারলে দ্রুত তারা মধ্য ইউরোপের দেশগুলিতে পৌঁছাতে উত্তর সার্বিয়ার দিকে পাড়ি দেবে। সেখান থেকে তারা ফ্রান্স বা স্পেনে যাবেন।

বলকান রুটে অভিবাসীদের যাতায়াত বেড়েছে। বেলগ্রেড-ভিত্তিক এনজিও ক্লিক অ্যাকটিভের-এর অনুমান অনুযায়ী, ২০২২ সালের শুরু থেকে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ সার্বিয়ায় প্রবেশ করেছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং প্রজাতন্ত্রের শরণার্থী ও সার্বিয়ার অভিবাসন কমিশনের (কেআইআরএস) সম্মিলিত তথ্য অনুসারে ২০২১ সালে যা ছিল ৬০ হাজার ৩৩৮ জন।

বসনিয়ার পরিবর্তে যেসব অভিবাসীরা সার্বিয়াকে বেছে নেন তাদের কাছে বেলগ্রেড একটি জরুরি ট্রানজিট শহর। কারণ এই শহরের কেন্দ্রীয় অবস্থান। দক্ষিণ দিক থেকে আসা ট্যাক্সি বা বাসগুলো সার্বিয়ার রাজধানীতে থামে। অন্যরা হাঙ্গেরি এবং রোমানিয়া সীমান্তের উত্তরের দিকে রওনা দেন। অভিবাসীরা এই লে-ওভার শহরে কিছুদিনের জন্য বিরতি পান এবং পরবর্তী পরিকল্পনা করতে পারেন।

'থাপ্পড়, লাথি এবং অমানুষিক মারধর'

সার্বিয়ার রাজধানীটি এখন অবশ্য বিশ্রামের জন্য ভালো জায়গা নয়। ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অঞ্চলের একমাত্র অভ্যর্থনা কেন্দ্রটি রয়েছে ওব্রেনোভাক শহরে। সেটি একমাত্র সচল। ৩০০ জনেরও বেশি লোক এই কেন্দ্রের সামনে ১৩ অক্টোবর শিবির বানিয়ে ছিলেন যার মধ্যে ১৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। অনেক অভিবাসী বেলগ্রেডের সবুজ এলাকাগুলি পছন্দ করেন, যেমন- ট্রেন স্টেশন এবং বাস স্টেশনের পাশের ছোট পার্ক।

শুকনো ঘাসের উপর অনেক সময় নিজেদের ব্যাকপ্যাক নিয়ে অস্থায়ী বসতি গড়েন অভিবাসীরা। ছোট পথের সারিবদ্ধ বেঞ্চগুলিতে অবশ্য কাউকে শুয়ে থাকতে দেখা যায় না। পার্কের প্রবেশপথে একটি ছোট সংবাদপত্রের স্ট্যান্ডে অভিবাসীদের তাদের ফোন রিচার্জ করার সুযোগ পান, তবে কিছু সার্বিয়ান দিনার দিতে হয়।

খাওয়া-দাওয়ার জন্য, আচরাফ এবং তার সঙ্গীরা স্থানীয়দের উপর নির্ভর। গত দুই দিন স্থানীয়রা তাদের কিছু খাবার দিয়েছিল। তিনি বলেন, "পুলিশ রাতে আমাদের পাকড়াও করতে আসে, তাই আমরা এখানে ফিরে আসি। স্টেশনে, তারা আমাদের একা ছেড়ে দেয়। তরুণ মরোক্কানদের জন্য স্টেশনের ভিতরে আশ্রয় পাওয়া অসম্ভব। হলুদ রংয়ের একটি বিশাল সরকারি ভবন রয়েছে যেখানে পৌরসভা একটি সংগ্রহশালা বানাতে চায়। সেটির দরজাও বন্ধ থাকে।" 

উত্তর সার্বিয়ায় অবস্থিত হাঙ্গেরি সীমান্তের একটি অংশ। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
উত্তর সার্বিয়ায় অবস্থিত হাঙ্গেরি সীমান্তের একটি অংশ। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


বাইরে ঘুমানো এই অভিবাসীদের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা বলা যেতে পারে। বেলগ্রেডে আসার আগে, অনেকে ইউরোপের সীমান্তে সহিংসতার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে গ্রিস এবং তুরস্ক সীমানায় কিংবা সার্বিয়া-বুলগেরিয়া সীমান্ত নিয়েও। আচরাফ বলেন, "পুলিশ লোকজনকে পাকড়াও করলে খুব মারধর করে। আমার এক বন্ধুর মাথায় এত জোরে আঘাত করা হয়েছিল যে, সে পরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। "

অভিবাসীরা এবং এনজিওগুলি নিয়মিত তুরস্কের সঙ্গে বুলগেরিয়া সীমান্তে সহিংস পুশব্যাকের নিন্দা করেছে। গত মে মাসে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রিপোর্ট করেছে, বুলগেরিয়া কর্তৃপক্ষ আফগান এবং অন্যান্য আশ্রয়প্রার্থী এবং অভিবাসীদের আক্রমণ করার জন্য পুলিশ কুকুর ব্যবহার করেছিল। এরপর মারধর করে, ডাকাতি করে, ছিনতাই করে কোনো সরকারি আশ্রয় প্রক্রিয়া ছাড়া কথা না বলে তুরস্কে ফিরিয়ে দিয়েছিল।

২০২১ সালের শেষের দিকে, হেলসিঙ্কি কমিটির বুলগেরিয়া শাখা বুলগেরিয়া থেকে দুই হাজার ৫১৩টি পুশব্যাক রেকর্ড করেছে। সার্বিয়া এবং উত্তর মেসিডোনিয়ার সীমান্তে আরো দক্ষিণে অনেকগুলি পুশব্যাক ঘটেছে, যেখানে সার্বিয়া ২০২০ সালে একটি কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করেছিল।

কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, সার্বিয়া একই বছরে দক্ষিণ সীমান্তে ৩৮ হাজারের বেশি অনিয়মিত পারাপার প্রতিরোধ করেছে। মানবাধিকার আইনজীবী নিকোলা কোভাচেভিচ বলেছেন, নির্বাসনগুলি "প্রায়ই খুব হিংস্র।থাপ্পড়, লাথি, রাবারের লাঠি দিয়ে আঘাত, অপমান, হুমকি কিছুই বাদ ছিল না।"

সার্বিয়ান পুলিশ ২০২২ সালের ৫ অক্টোবর হাঙ্গেরির সীমান্তের কাছে প্রায় ২০০ অভিবাসী এবং শরণার্থীদের আবাসনের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে অভিযান চালায়। ছবি: সার্বিয়ান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়/এপি/পিকচার অ্যালায়েন্স
সার্বিয়ান পুলিশ ২০২২ সালের ৫ অক্টোবর হাঙ্গেরির সীমান্তের কাছে প্রায় ২০০ অভিবাসী এবং শরণার্থীদের আবাসনের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে অভিযান চালায়। ছবি: সার্বিয়ান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়/এপি/পিকচার অ্যালায়েন্স


'মানুষ প্রতিদিন আসে'

বেলগ্রেডের মূল বাস স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিট দূরে অবস্থিত ওয়াশ সেন্টারে মূলত রোজই আসেন কোনো না কোনো অভিবাসী । ২০২০ সালে কালেক্টিভ এইড অ্যাসোসিয়েশন এটি তৈরি করে । অভিবাসীরা এখানে স্নান করতে পারেন, জিনিসপত্র ধুতে পারেন এবং এক কাপ চা বা কফি পান করতে পারেন। এই শীতল ও রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে এই ভবনের সামনে প্রায় ১৫ জন মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। কাবুলের একজন সাবেক পুলিশ অফিসার করিমও ছিলেন তাদের মধ্যে। এক কাপ প্লাস্টিকের চা হাতে নেয়ার আগে চোখটা কচলে নেন তিনি। করিমের চুলও সম্পূর্ণ এলোমেলো।

এনজিওর কাছে কিছু জামাকাপড় নিতে এসেছেন করিম। কালেক্টিভ এইড অভিবাসীদের এ সব জিনিস দান করে। আফগানিস্তানের সাবেক পুলিশ অফিসার জানান, "আমার কাছে এই মুহূর্তে কোনো টাকা নেই। " ধূসর রংয়ের জগিং প্যান্টটি দেখিয়ে বলেন, "আমি খুব খুশি যে এটা আমি পেয়েছি।"

ক্লডিয়া লোম্বার্দো অন্য তিনজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে ওয়াশ সেন্টার পরিচালনা করেন। তিনি ইনফোমাইগ্রান্টসকে বলেন, "জুন থেকে, প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন লোক স্নান করতে আসে এবং আমরা ৩০টি ওয়াশিং সাইকেল চালাই। এইখানে ছোটো জায়গাও রয়েছে যেখানে হাত মুখ ধোয়া কিংবা দাড়ি কামানো সম্ভব। নারীদের জন্য স্যানিটারি প্যাডও সরবরাহ করা হয়। অভিবাসীরা প্রতিদিন বিকেলে এক ঘণ্টা স্নান করতে পারেন।

ওয়াশিং মেশিনের সামনে একটি ছোট কাউন্টারে একজন লম্বা যুবক ক্যানভাসের ব্যাকপ্যাক খুলে কিছু কাপড় বের করছিলেন। ৩০ বছর বয়সি মোহাম্মদ ছয় সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বেলগ্রেডে এসেছেন।


তরুণ সিরীয় ছয়বার সার্বিয়ার উত্তরের মাজদান থেকে রোমানিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। প্রতিবার, রোমানিয়ার সীমান্তরক্ষীরা তাকে সহিংসভাবে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। তার অভিযোগ, সঞ্চয় চুরি করে নিয়েছে বাহিনী। তার কথায়, "আমি সেখানকার পরিস্থিতি আর সহ্য করতে পারিনি তাই এখানে একটু বিশ্রাম নিতে এসেছি।" তিনি গত দুই রাত ওব্রেনোভাক ক্যাম্পে ঘুমাচ্ছেন। তবে গদিগুলো পোকামাকড়ে ভর্তি।

দিনের বেলা তিনি ওয়াশ সেন্টারে আসেন। এটি তার চেনা জায়গা। তার কথায়, "তুরস্ক ছেড়ে গ্রিস, আলবেনিয়া এবং কসোভো অতিক্রম করার পর আমি ক্লান্ত এবং অসুস্থ ছিলাম। আমি ওষুধ কিনতে চেয়েছিলাম কিন্তু কোনো ওষুধের দোকানে আমাকে ঢুকতে দেয়নি। রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আচমকা ওয়াশ সেন্টার চোখে পড়ে। স্নান করতে পেরেছি। কথা বলার মানুষ পেয়েছি। এটাই একটু শান্তির। তারা আমার যত্নও নিয়েছে। "


মার্লেন পানারা/আরকেসি

 

অন্যান্য প্রতিবেদন