আশ্রয় আবেদনের জট কমাতে বিভিন্ন খাত থেকে অদক্ষ ও সাধারন কর্মীদের ব্রিটিশ হোম অফিসে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
আশ্রয় আবেদনের জট কমাতে বিভিন্ন খাত থেকে অদক্ষ ও সাধারন কর্মীদের ব্রিটিশ হোম অফিসে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

জমে থাকা হাজারো আশ্রয় আবেদনের জট কমাতে ম্যাকডোনাল্ডস, টেসকো এবং আলদির মতো প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী নিয়োগ দিয়েছে ব্রিটিশ হোম অফিস। এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশ্রয় আবেদনের বিশাল জট পরিষ্কার করতে একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে, ম্যাকডোনাল্ডস, টেসকো এবং আলদির মতো প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক পরিষেবা এবং বিক্রয়কর্মী হিসেবে কর্মরত ব্যক্তিদের আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। 

হোম অফিসের আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ২০ বছর ধরে সরাসরি জড়িত এক হুইসেলব্লোয়ারের দেয়া তথ্য ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই তথ্য বের করতে সক্ষম হয় গার্ডিয়ান। ওই ব্যক্তি বর্তমানে নিয়োগ পাওয়া নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। 

অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ করা নতুন কর্মকর্তাদের আশ্রয় ব্যবস্থার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান নেই। তাদের অনেককে নিয়োগের পর তিন মাসের জন্য অস্থায়ী চুক্তিতে রাখা হয়। 

আরও পড়ুন>>ইংলিশ চ্যানেলে মানবপাচারে জড়িত পাচঁ ব্যক্তির কারাদণ্ড

নিয়োগের আগে ব্যাপক প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও অনেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়োগের দুই দিন পর আশ্রয়প্রার্থীদের জটিল সাক্ষাৎকার নিতে পাঠানো হয়। কোনো প্রকার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই আশ্রয় আবেদনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে ছেড়ে দেয়া হয়। 

ওই হুইসেলব্লোয়ার গার্ডিয়ানকে বলেন, “হোম অফিস বর্তমানে অনেক বেশি অনভিজ্ঞ লোক নিয়ে আসছে। যাদের আশ্রয় ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো ন্যূনতম কোন ধারণা নেই। অনেককেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। ফলে তারা চলে গিয়েছেন।”

তার মতে, “এটি সম্পূর্ণ বিপর্যয়। তারা জানে না তারা কী করছে।”

‘ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বল করেছে’

সম্প্রতি ‘অবজারভার’ প্রকাশিত একটি জনমত জরিপে উঠে এসেছে, ব্রিটিশ জনসাধারণের মধ্যে ৭৩ শতাংশ নাগরিক বিশ্বাস করে যে ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন তার সীমানাগুলির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে পারেনি। মাত্র ১২ শতাংশ বিশ্বাস করে যে ব্রিটেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে।

পড়ুন>>যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নিবন্ধন কেন্দ্রে হামলার পর এক ব্যক্তির আত্নহত্যা

জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেনের সীমান্ত পরিচালনার ক্ষমতা আরো খারাপ হয়েছে।

গত সপ্তাহে নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনক পার্লামেন্টে স্বীকার করেন, আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ের হার আসলেই ‘পর্যাপ্ত নয়’। সরকার আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত প্রদানকারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা ৮০ শতাংশ বাড়িয়েছে। দ্রুত আরো ৫০০ জনকে নতুন করে নিয়োগ করা হবে।

বর্তমানে এক হাজার ৯০ জন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তা ফাইল জট কমাতে ব্রিটিশ হোম অফিসে কাজ করছেন। বর্তমানে এক লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি আশ্রয় আবেদনের ফাইল আটকে আছে। 

আবেদন যাচাইয়ের ধীরগতির কারণে অনেক আশ্রয়প্রার্থীকেই দীর্ঘ সময় সরকার হোটেলে অথবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে সরকার প্রতিদিন পাচঁ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি অর্থ খরচ করছে এবং কেন্টের ম্যানস্টন অ্যাসাইলাম প্রসেসিং সেন্টারে ভিড় বাড়ছে। 

আরও পড়ুন>>যুক্তরাজ্যে গাঁজা চাষে বাধ্য হন যে অভিবাসীরা

ব্রিটিশ হোম অফিসের কর্মকর্তারা সম্প্রতি স্বীকার করেন, গত বছর ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা ২৮ হাজার ৫২৬ জনের মধ্যে মাত্র এক হাজার ১৪১টি আবেদন অর্থাৎ মাত্র চার শতাংশ আবেদনের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। 

হুইসেল ব্লোয়ার স্বীকার করেন, “আশ্রয় আবেদনে নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাকি এবং আফগানদের।”

তিনি আরো যোগ করেন, "যদি কোনো সাংবাদিক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আশ্রয় আবেদন সম্পর্কে হোম অফিসের কাছে জানতে চায়, ধরে নেয়া হয় এটা নিশ্চয়ই হাই প্রোফাইল আবেদন। সেক্ষেত্রে এই আবেদন দ্রুত সিনিয়রদের কাছে হস্তান্তর করা হয় যাতে সেটি দ্রুত দেখা হয়।

নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে বলতে গিয়ে তিনি জানান, “আমার কাছে এমন লোকও আছে এসেছেন যারা দেশের ইতিহাস জানতে পরামর্শ খুঁজছেন। কারণ হোম অফিসের নির্দেশিকা যথেষ্ট নয়।”

পড়ুন>>যুক্তরাজ্য: কর্তৃপক্ষের ভুলে ঝুঁকিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক আশ্রয়প্রার্থীরা

অভিযোগ অস্বীকার হোম অফিসের

দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কর্মকর্তারা গত ছয় মাসের পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে জানিয়েছেন, ২০১২ সালের আগে আশ্রয় আবেদনের সাক্ষাৎকারের মান খুব ভালো ছিল। যখন থেকে আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের মান উচ্চ নির্বাহী অফিসার গ্রেড থেকে নির্বাহী অফিসারে নামিয়ে দেওয়া হয় তখন থেকে সাক্ষাৎকারের গুণগতমান কমে আসে।

হোম অফিসের একজন কর্মী বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত দক্ষতার কাজ কিন্তু কর্মকর্তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। মানের চেয়ে সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।”

এই দাবির ব্যাপারে ব্রিটিশ হোম অফিসের একজন মুখপাত্র বলেন, “এখানে যেসব দাবি করা হচ্ছে তা ভিত্তিহীন। আমরা ২০১৯ সাল থেকে আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ের জড়িত কর্মীদের নিয়োগ ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছি। সমস্ত নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অবশ্যই ন্যূনতম সিভিল সার্ভিস নিয়োগের মান পূরণ করতে হবে। এছাড়া তাদেরকে সিনিয়র প্রশিক্ষক এবং প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয়া হয়।”

আরও পড়ুন>>সাজাপ্রাপ্ত অভিবাসীদের নজরদারিতে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব

তিনি আরো বলেন, “আমাদের প্রক্রিয়াগুলি সুরক্ষা এবং গুণমান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া একটি শক্তিশালী কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সবকটি আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত ঠিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলি ঠিক এবং যাদের সত্যি সুরক্ষার প্রয়োজন তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়।”


এমএইউ/আরকেসি  (দ্য গার্ডিয়ান)




 

অন্যান্য প্রতিবেদন