সম্প্রতি মানবপাচার বিষয়ে বাংলাদেশ সফর করেছেন জাতিসংঘের মানবপাচার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক সিয়োভান মুলালী। ছবি: টুইটার @UN_SPExperts
সম্প্রতি মানবপাচার বিষয়ে বাংলাদেশ সফর করেছেন জাতিসংঘের মানবপাচার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক সিয়োভান মুলালী। ছবি: টুইটার @UN_SPExperts

জাতিসংঘের মানবপাচার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বলেছেন, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তির সুরক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় স্থানীয় পাচারচক্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা আরও জোরদার করা প্রয়োজন৷ গত ৩১ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর শেষে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এই মন্তব্য করেন তিনি৷

জাতিসংঘের মানবপাচার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক সিয়োভান মুলালীর দশ দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে৷ এই সফরে তিনি মানবপাচার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা নারী ও শিশুদের জন্য পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেছেন৷ 

৯ নভেম্বর ২০২২ রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্যান প্যাসিফিক সোনারগাও হোটেলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ প্রতিনিধি তার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন৷


সংস্থাটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বলা হয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তিনি মানবপাচারজনিত দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গেও দেখা করেন৷ ভুক্তভোগী সাবেক অভিবাসীরা পাচারকালে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তাকে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন৷ 

আরও পড়ুন>>বৈধ পথে এসেও রোমানিয়ায় প্রতারণার শিকার বাংলাদেশি শ্রমিকেরা 

সিয়োভান মুলালীর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং পুরো সফরের প্রতিবেদনে উপস্থাপিত বিশ্লেষণগুলো মানবপাচার রোধে বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে৷

সফর শেষে তৈরি করা প্রতিবেদনের মূল প্রস্তাব হবে কোনো বৈষম্য ছাড়া পাচার প্রতিরোধে এবং ক্ষতিগ্রস্থ ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা, যাতে এ ধরনের ঘটনার শিকারদের সুরক্ষা দেওয়া যায়৷  

সফরে বাংলাদেশে অবস্থিত একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন সিয়োভান মুলালী। ছবি: টুইটার
সফরে বাংলাদেশে অবস্থিত একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন সিয়োভান মুলালী। ছবি: টুইটার


বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন সেফ অর্ডারলি এন্ড রেগুলার মাইগ্রেশনের অগ্রগতির জন্য নেতৃত্ব প্রদানকারী ভূমিকা পালন করেছে৷ বিশেষ ধরনের আইন ও নীতির মধ্য দিয়ে নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারনের পক্ষে বাংলাদেশ কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সিয়োভান মুলালী৷

পড়ুন>>বাংলাদেশিসহ ২৩০ অভিবাসী নিয়ে ফ্রান্সে ওশান ভাইকিং

মানবপাচার রোধে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার ২০১৮-২০২২ অ্যান্টি-ট্রাফিকিং ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান (এনএপি) বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে এবং একটি নতুন ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম)-এ সংযুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ ইতিমধ্যে একটি ন্যাশনাল এন্টি-ট্রাফিকিং টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে৷


জাতিসংঘের প্রতিবেদক মনে করেন, ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান এবং ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজমের সঙ্গে একীকরণ পাচারবিরোধী কার্যক্রমের উদ্যোগ জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে সমন্বয়কে আরও জোরদার ও ফলদায়ক করতে পারে৷

উদ্বেগের বিষয় অভ্যন্তরীণ পাচারচক্র

বিবৃতিতে বলা হয়, ন্যাশনাল এন্টি ট্র্যাফিকিং টাস্ক ফোর্স নামক একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও টাস্ক ফোর্সের প্রভাবকে শক্তিশালী করতে আরো কর্ম তৎপরতার প্রয়োজন রয়েছে৷ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ পাচারসহ সকল প্রকার পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে৷ 

তিনি বলেন, ‘‘বাস্তবে পাচার প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করতে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অতি গুরুত্বপূর্ণ৷’’ 

পড়ুন>>‘বসনিয়া থেকে নিজে নিজেই ম্যাপ দেখে ইটালি চলে এসেছি’

পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাচারচক্রের সক্রিয়তা একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন৷ 

তার মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় যৌন শোষণ, গৃহ দাসত্ব এবং জোরপূর্বক শ্রমসহ সব ধরণের শোষণে জড়িত পাচারচক্রের ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান এখনো সীমিত৷ এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) পূরণে অভ্যন্তরীণ পাচার মোকাবিলায় পদক্ষেপ জোরদার করা খুবই প্রয়োজন৷

অভ্যন্তরীণ পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, সামাজিক পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন৷ বর্তমানে, অভ্যন্তরীণ পাচারের ব্যাপকতা সম্পর্কে তথ্য বা গবেষণা সীমিত রয়েছে৷

যৌন নির্যাতনের উদ্দেশ্যে মানবপাচার

বিশেষ প্রতিবেদকের মতে, যৌনকাজে ব্যবহারের উদ্দেশে পাচারের যে ঘটনা ঘটছে তা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে৷ যার ফলে সুরক্ষা এবং প্রতিরোধের ব্যর্থতা বেড়ে যায়৷

আরও পড়ুন>>গ্রিস থেকে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের বহিষ্কার অব্যাহত

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তঃসীমান্ত বিশেষ করে ভারতে যৌন কাজে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে নারী পাচার একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়৷ পুলিশ, স্থ্যসেবাকর্মী, সামাজিক পরিষেবা এবং বৃহত্তর সমাজের পক্ষ থেকে বৈষম্যমূলক মনোভাব অব্যাহত থাকার কারণে যৌনকর্মীদের শোষণমূলক আচরণ থেকে সুরক্ষার সুযোগ সীমিত৷ 

তিনি মনে করেন, ‘‘যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে৷ যৌনকর্মীদের ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা এবং পাচারসহ নানা ধরনের শোষণের অভিযোগগুলি খুব কমই পুলিশ দ্বারা তদন্ত হয়৷ এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খুব কমই সহায়তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়৷’’

জোরপূর্বক শ্রম শোষণের উদ্দেশ্যে পাচার

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মিথ্যা চাকরির প্রলোভন, নিয়োগকারী সংস্থা এবং মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের দ্বারা খুব বেশি নিয়োগ ফি ধার্য্য করা, অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা এবং নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার মতো বিষয়সমূহ পাচার-কাজ অব্যাহত রাখতে সাহায্য করে৷

পড়ুন>>মানবপাচার রোধে ন্যূনতম মানে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ: মার্কিন প্রতিবেদন

বিদেশ ফেরত অভিবাসী শ্রমিকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে শোষণের ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং ঋণ পরিশোধে ও নতুন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিশোধ ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে৷ অভিযোগ নিষ্পত্তির চাপ এবং নিষ্পত্তির হারের পরিমাণ কম হওয়ায় বিভিন্ন নিয়োগ সংস্থা ও মধ্যস্থতাকারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রেও কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না৷

যদিও সালিসি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতিগুলি কার্যকর, তবুও এগুলোর উচিত নয় মানবপাচারের তদন্ত এবং বিচারের ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা৷

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ প্রয়োজন৷ অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা; বাংলাদেশকেও এ ধরনের নিয়োগ বন্ধে এবং কর্মীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঘাটতিসমূহ প্রতিকারের জন্য পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে৷

দশদিনের সফরে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইনজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাত করেছেন৷ মানবপাচারের শিকারদের পাশাপাশি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসীকর্মী, যৌনকর্মী, জোরপূর্বক বিয়ে, জোরপূর্বক শ্রম এবং গৃহকর্মের শিকারদের জন্য কাজ করেন এমন সংগঠনগুলোর সাথে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেন৷

আরও পড়ুন>>চলতি বছরই গ্রিসে বাংলাদেশি কর্মী নেয়া ও অনিয়মিতদের কাগজ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু

বিশেষ প্রতিবেদক জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ, আন্তর্জাতিক এনজিও, দূতাবাস এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন৷ 


এমএইউ/আরআর 




 

অন্যান্য প্রতিবেদন