ফাইল ফটো: রাবার ডিঙ্গিতে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চাওয়া একদল অভিবাসীকে উদ্ধার করা হচ্ছে | ছবি: রয়টার্স
ফাইল ফটো: রাবার ডিঙ্গিতে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চাওয়া একদল অভিবাসীকে উদ্ধার করা হচ্ছে | ছবি: রয়টার্স

বিপজ্জনক অনিয়মিত পথে ইউরোপে পাঠাতে শরণার্থী ও অভিবাসীদেরকে বিভিন্ন ভুল এবং বিকৃত তথ্য প্রদান করেন মানবপাচারকারীরা৷ এখানে সেরকম তিনটি তথ্য যাচাই করা হলো৷

নিপীড়ন এবং দরিদ্রতার মতো কারণে অনেকে দেশান্তরী হতে চান৷ অনিয়মিত পথে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্রবেশ করতে অনেক অভিবাসী ও শরণার্থী মানবপাচারকারীদেরকে মোটা অংকের টাকাও দেন৷ এই পাচারকারীরা অনিয়মিত পথে যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে জানান না৷ বরং ইউরোপ সম্পর্কে এমন এক জীবনের কথা বলেন যা অনেকক্ষেত্রেই সঠিক নয়৷  

ডয়চে ভেলে এমন তিনটি বিষয় যাচাই করেছে যেগুলো পাচারকারীরা প্রায়ই শরণার্থী ও অভিবাসীদের বলে থাকেন:  

প্রথম দাবি: ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ নিরাপদ৷

ডয়চে ভেলের অনুসন্ধান: মিথ্যা তথ্য৷  

২০১৬ সালে ইইউতে প্রবেশ করেন সিরীয় শরণার্থী আনাস মুস্তফা৷ এক সাক্ষাৎকারের তিনি জানান, মানবপাচারকারীরা তাকে বলেছিলেন যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়া খুবই সহজ এবং মাত্র দুই ঘণ্টায় সেটা করা যায়৷

বাস্তবতা হচ্ছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ২০১৪ সাল থেকে এখন অবধি ২৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন৷ 

ফলে আনাসকে যে তথ্য দেয়া হয়েছিল ডয়চে ভেলের গবেষণা বলছে, সেই তথ্য ভুল৷ চলতি বছর ২৮ নভেম্বর অবধি অনিয়মিত পথে অন্তত এক লাখ ৩৩ হাজার পাঁচশো ৫১ জন মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএম৷ 

জাতিসংঘের আরেক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসেবে একই সময়ে ভূমধ্যসাগরে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত একহাজার আটশো ৩৩ জন৷


 এই সংখ্যাগুলো জানাচ্ছে অনিয়মিত পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়া মোটেই নিরাপদ নয়৷ আর লিবিয়া বা টিউনিশিয়া থেকে ইউরোপের কোনো একটি দেশের দূরত্ব অন্তত ৩০০ কিলোমিটার৷ অভিবাসী বা শরণার্থীরা যেসব নৌকা ব্যবহার করে এই পথ পাড়ি দিতে চান সেগুলো অধিকাংশক্ষেত্রেই সাগরে চলার উপযুক্ত নয়৷ ফলে প্রায়শই দুর্ঘটনায় পড়ে৷ দুই ঘণ্টা নয়, অনিয়মিত উপায়ে এই পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে৷ নৌকার ধরন, সমুদ্রের অবস্থা, রুটের দূরত্বসহ নানা কিছুর উপর বিষয়টি নির্ভর করে৷ 

দ্বিতীয় দাবি: অন্তঃসত্ত্বা বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় পাওয়া যায়৷ 

ডয়চে ভেলের অনুসন্ধান: মিথ্যা তথ্য৷

অন্তঃসত্ত্বা বা অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেই আপনি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হবেন না৷ সবারই একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে৷ তবে, এক্ষেত্রে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়৷  

ইউএনএইচসিআরের ক্রিস মেলৎসার এই বিষয়ে বলেন, ‘‘এটা সত্যি যে শিশুদের বিতাড়ন করা হয় না৷ কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদেরকে দ্রুত শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়৷ তাছাড়া শিশুদেরও এক পর্যায়ে আঠারো বছর বয়স হয়৷’’

কখনো কখনো শিশু জন্ম দেয়া নারী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুটির বয়স আঠারো হওয়ার পর তারা ইইউভুক্ত কোনো দেশে থেকে যেতে পারেন৷ এটার কারণ হচ্ছে তার অনেক বছর ধরে সেখানে আছেন এবং সেই সমাজে একীভূত হয়েছেন৷ 

প্রতিটি আশ্রয়ের আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়৷ ফলে অন্তঃসত্ত্বা বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলেই নিশ্চিতভাবে আশ্রয় পাওয়া যায় না৷ একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় আবেদন পর্যালোচনার সময় আপনি সাময়িকভাবে বিশেষ সুরক্ষা পেতে পারেন৷ কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কী হবে সেটা আলাদা ব্যাপার৷ 

তৃতীয় দাবি: ইইউতে ভালো বেতনের চাকুরি সহজে এবং দ্রুত পাওয়া যায়৷  

ডয়চে ভেলের অনুসন্ধান: বিভ্রান্তিকর৷ 

‘‘আপনি যখন ইউরোপে থাকবেন, তখন সপ্তাহে একদিন কাজ করতে হবে৷ দিনে তিনশো, চারশো ইউরো পাবেন আপনি৷ আর দ্রুত থাকার জন্য একটি অ্যাপার্টমেন্ট পাবেন,’’ সিরীয় শরণার্থী আনাস মোস্তফাকে এসব কথা বলেছিলেন মানবপাচারকারীরা৷ 


বাস্তবতা হচ্ছে, কাজ করার বৈধ অনুমতি ছাড়া ইউরোপে কাজ পাওয়া বেশ কঠিন৷ যদিও কিছু শরণার্থী ও অভিবাসী অবৈধপথে কাজ করেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে তাদের খারাপ পরিবেশে কাজ করতে হয় এবং প্রায়ই ন্যায্য মজুরি পান না তারা৷ 

ইইউভুক্ত কোনো একটি দেশে আশ্রয়ের আবেদন করার পর অবশ্য বিষয়টি ভিন্ন৷ কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণত আবেদন করার নয়মাসের মধ্যেই প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে কাজ করার অনুমতি পান আশ্রয়প্রার্থীরা৷ 

ভালো কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভাষাও এক বড় বাধা৷ ফলে দেখা যাচ্ছে, শরণার্থী বা অভিবাসীরা যেসব ক্ষেত্রে কাজ করছেন সেগুলোতে বেতন বেশি নয়৷ ভালো বেতনের চাকরির জন্য তাদের বিভিন্ন যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়৷ প্রক্রিয়াটি সহজ নয়৷ 

এআই/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন