সম্প্রতি ডেনমার্কে বহু শরণার্থীর রেসিডেন্স পারমিট বাতিল করা হয়েছে। ছবি: এপি/পিকচার এলায়েন্স
সম্প্রতি ডেনমার্কে বহু শরণার্থীর রেসিডেন্স পারমিট বাতিল করা হয়েছে। ছবি: এপি/পিকচার এলায়েন্স

সুইডেনের কট্টর ডান প্রভাবিত সরকার ইইউর সভাপতিত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর যৌথ অভিবাসন নীতির পরিকল্পনাও একটি বিশাল ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। অপরদিকে ডেনমার্কের নতুন বাম-ডান জোট সরকারকে দেশটির কিছু কঠোর অভিবাসন নীতি সহজ করতে দেখা গিয়েছে।

সুইডেনের ইইউ প্রেসিডেন্সি ইইউ-ব্যাপী অভিবাসন নীতি তৈরিতে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির আশা জাগিয়েছে।

২০১৫ সাল থেকে ইইউ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে অচলাবস্থায় রয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবনা সত্ত্বেও, দেশগুলো বাধ্যতামূলক শরণার্থী কোটার ধারণা পূরণ করছে না। 

ইইউ মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে ধীর অগ্রগতি হলেও মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী চেম্বারে এটি এখন আরও বাধার সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

আরও পড়ুন>>ডেনমার্ক থেকে প্রত্যাবাসনের ঝুঁকিতে সিরীয় তরুণীরা

সুইডেনের তিন-দলীয় মধ্য-ডান জোট ইতিমধ্যে অভিবাসন-বিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সরাসরি সরকারের অংশ না হয়েও দেশটির কট্টর ডানপন্থিদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনি বর্তমান সরকার। কারণ মডারেট, খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাট এবং লিবারেলদের নিয়ে গঠিত নতুন জোটটি সংসদে আইন পাস করতে কট্টর ডানপন্থিদের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হবে।


এক কোটি জনসংখ্যার দেশ সুইডেনে ২০১৫ সালে এক লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি শরণার্থী নিবন্ধিত হয়। ছবি: ডিপিএ/পিকচার এলায়েন্স
এক কোটি জনসংখ্যার দেশ সুইডেনে ২০১৫ সালে এক লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি শরণার্থী নিবন্ধিত হয়। ছবি: ডিপিএ/পিকচার এলায়েন্স


নতুন সুইডিশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। উদ্বাস্তুদের স্থায়ী আশ্রয় দেওয়ার ধারণা বাতিল করে শরণার্থীদের সংখ্যা কমানোর অঙ্গীকার করেছে সরকার।

সরকার আরও জানিয়েছে, তারা দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা কমিয়ে আনতে শ্রম-ভিত্তিক অভিবাসনের জন্য ন্যূনতম মাসিক আয় তিনগুণ করার পরিকল্পনা করছে।

ইইউ প্রেসিডেন্সির প্রভাব

২০২২ সালের নভেম্বরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে সোশ্যালিস্ট এবং ডেমোক্র্যাটদের নেতা ইরাটক্সে গার্সিয়া পেরেজ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্সিতে সুইডেনের কট্টর ডানদের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে টুইটারে তার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

তিনি জানান, “সারা ইউরোপজুড়ে আইনের শাসন রক্ষা, সমতার প্রচার এবং একটি সাধারণ অভিবাসন ও আশ্রয় নীতিতে অগ্রসর হওয়া কট্টর ডানপন্থি প্রভাবিত সুইডিশ সরকারের কাছে কঠিন বলে মনে হচ্ছে।”

পড়ুন>>আশ্রয়প্রার্থী দম্পতিদের আলাদা করায় সাবেক ডেনিশ মন্ত্রীর কারাদণ্ড

ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে ইইউ-এর অভিবাসন পরিষেবার প্রাক্তন ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ক্রিশ্চিয়ান লেফলারের বরাত দিয়ে বলা হয়, সুইডেনের সরকারের এই [অভিবাসন] এজেন্ডাকে সক্রিয়ভাবে সামনে নিয়ে আসার কোন আগ্রহ নেই। 

তিনি দাবি করেন, “প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সুইডেন কোনো উৎসাহ ছাড়াই অভিবাসন সংক্রান্ত কাজ চালিয়ে যাবে। কারণ তারা ইইউর অত্যন্ত অনুগত একটি সদস্য রাষ্ট্র।”

ডেনমার্কের অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন

মডারেট, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এবং লিবারেলদের নিয়ে একটি বাম-ডান রাজনৈতিক জোটকে একত্রিত করেগঠিত হয়েছে ডেনমার্কের নতুন জোট সরকার। সরকার দেশের অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে বলে আভাস পাওয়া গিয়েছে।

১ নভেম্বর, ২০২২-এর জাতীয় নির্বাচনের পর ৪৩ দিনের তীব্র আলোচনার চলে ডেনিশ রাজনীতিতে। নানা সমীকরণের পর লিবারেল, দুটি মধ্যপন্থি ডান দল এবং নবগঠিত মডারেট দলসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেনের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করতে সক্ষম হয়ে।

আরও পড়ুন>>শেঙেনে ক্রোয়েশিয়া, বলকান রুটে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে

ফ্রেডরিকসেন পূর্ববর্তী একক বামপন্থি সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন, যেটি ইউরোপজুড়ে কঠোর অভিবাসন নীতির জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। বিশেষ করে তার বিতর্কিত রুয়ান্ডা আশ্রয় পরিকল্পনার ও সিরিয়ার আশ্রয়প্রার্থীদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনার কারণে বারবার সমালোচনার মুখে পড়ে ডেনমার্ক।

এখন তার দল ডানপন্থি বিরোধীদের সঙ্গে জোট গঠন করেছে। যদিও অভিবাসন নিয়ে নতুন সরকাররে মনোভাব অনেকাংশে পরিবর্তন হবে এমন কোনো আশা নেই। 

নতুন জোট সরকার দেশটিতে অবস্থানরত বিদেশীদের প্রশাসনিক অবস্থার পরিবর্তন এবং বিতর্কিত রুয়ান্ডা আশ্রয় পরিকল্পনার সংশোধন করে পুনরায় তাদের সরকারি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সিরিয়ায় ‘ডিপোর্ট’

মূলত ২০১৯ সাল থেকেই ডেনমার্ক অভিবাসন নীতিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ‘শূন্য’ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

এটি করতে গিয়ে ডেনিশ সরকারকে অন্তত ৮০০ সিরীয়দের বসবাসের অনুমতি পর্যালোচনা করতে হচ্ছে।যাদের ডেনমার্কে বৈধ বসবাসের অনুমতি রয়েছে। যাদের এ জাতীয় পর্যালোচনা করা হয়েছে তারা দামেস্ক এবং আশেপাশের অঞ্চল থেকে এসেছেন। যেটিকে ডেনমার্ক ‘নিরাপদ এলাকা’ বলে মনে করেছে। কিন্তু অন্যান্য ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কেউই এই ধারণার সঙ্গে একমত না। ডেনিশ সরকারের এই পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিরীয় তরুণীরা।

২০২১ সালের এপ্রিলে কোপেনহেগেনে একটি বিক্ষোভ সমাবেশে বেআইনি ডিপোর্টেশনের বিরুদ্ধে বক্তব্যরত সিরীয় তরুণী আভিন ইসা। ছবি: ইমাগো
২০২১ সালের এপ্রিলে কোপেনহেগেনে একটি বিক্ষোভ সমাবেশে বেআইনি ডিপোর্টেশনের বিরুদ্ধে বক্তব্যরত সিরীয় তরুণী আভিন ইসা। ছবি: ইমাগো


ফলস্বরূপ, যেসব শরণার্থীরা কয়েক বছর ধরে ডেমার্কে বসবাস করছেন, এমন তরুণ ছাত্ররাসহ বেশ কয়েকটি হাই প্রোফাইল আবেদনের সাথে জড়িতদের যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

২০২২ সালের জুনে ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১১ সালে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩৪ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে ডেনমার্কে অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।

পড়ুন>>ডেনমার্ক: অভিবাসীদের জন্য ‘বাধ্যতামূলক কাজের’ প্রস্তাব

ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অভিবাসী এবং উদ্বাস্তুদের জন্য ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। শরণার্থীদের জোরপূর্ব দেশে ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি ফ্রেডেরিকসেনের নেতৃত্বাধীন সরকার আরও কয়েকটি বিতর্কিত নীতি চালু করেছে যেমন নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসরত অ-পশ্চিমা অভিবাসীদের সংখ্যা সীমিত করা এবং রুয়ান্ডায় আশ্রয় প্রক্রিয়াকরণ আউটসোর্সিং করা ইত্যাদি।

অনেকটা সুইডেনের মতো, এই নীতিগুলোর প্রতি সমর্থন ধরে রাখার প্রয়াসে উগ্র-ডানপন্থিদের ক্রমবর্ধমান উত্থানকে ছাড় দিয়ে চালিত হয়েছে ডেনিশ সরকারের নীতি।

দক্ষ শ্রমিকদের জন্য ব্যতিক্রম

ডেনমার্ক সরকারের নিয়ম শরণার্থীদের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি করবে না। এই ব্যতিক্রম নিয়মগুলো প্রধানত দক্ষ কর্মীদের জন্য উপকৃত হতে পারে, যারা দেশটিতে অধ্যয়নরত থেকে চাকরি প্রাপ্তির শর্ত পূরণ করে এবং ডেনিশ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। 

তুর্কি সংবাদপত্র আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, নতুন জোটের ঘোষিত পরিকল্পনা সুরক্ষা প্রদানের জন্য নির্বাচনী পদ্ধতিগুলোর বিরুদ্ধে অধিকার গোষ্ঠীগুলো তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে।

আরও পড়ুন>>বিতর্কিত ‘‘ঘেটো’’ আইন আরও কঠোর করতে চায় ডেনমার্ক

নতুন পদ্ধতিটি মূলত আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের অধীনে সুরক্ষার জন্য তাদের প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তে উদ্বাস্তুদের দ্বারা সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অবদানের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে।

জার্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ন্যায় ডেনমার্কও শ্রমিক ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। ডেনমার্কের নতুন জোট সরকার দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য শুধুমাত্র দক্ষ বিদেশী কর্মীদের কাছে ডেনমার্ককে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করছে।

গত বছর ডেনমার্ক এবং যুক্তরাজ্য উভয়ই রুয়ান্ডায় আশ্রয় প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং করার জন্য তাদের বিতর্কিত পরিকল্পনা চালিয়েছিল। যদিও নতুন ডেনিশ সরকার দাবি করেছে যে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আইনিচাবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে চায়। 

ইইউতে অবশ্য বর্তমানে এই প্রস্তাবের পক্ষে তেমন কোন সমর্থন নেই। উপরন্তু, ডেনমার্কের অনেক বিশেষজ্ঞ এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।


ডেনিশ শরণার্থী কাউন্সিলের (ডিআরসি) আশ্রয় ও শরণার্থী অধিকার বিভাগের পরিচালক ইভা সিঙ্গার আনাদোলু এজেন্সিকে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতার সমালোচনা করে বলেছেন, “ডেনমার্ক একা এটি করতে চাচ্ছে না। বরং, এটি অন্যান্য ইইউ দেশগুলোকে নিয়ে একযোগে এটি করার চেষ্টা করছে। তবে অন্যান্য ইইউ দেশগুলো এই পরিকল্পনায় অংশ নিতে পারে না কারণ এটি ইইউর আইনের বিপরীত।”

সিঙ্গার আনাদোলু এজেন্সিকে আরও বলেন, “ ডেনিশ সরকারের কাছে এটা খুব স্পষ্ট হয়েছে, এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।বাস্তবিক অর্থে, আপনি যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে চান তাহলে এটা করা খুবই জটিল।”


মূল প্রতিবেন নাতাশা মেলেরশ। ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলায় ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/আরকেসি




















 

অন্যান্য প্রতিবেদন