ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের সাথে সী-আই উদ্ধারকারী, নভেম্বর ১৪, ২০২২। ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ আরওপিআই/জো রাবে
ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের সাথে সী-আই উদ্ধারকারী, নভেম্বর ১৪, ২০২২। ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ আরওপিআই/জো রাবে

বিভিন্ন এনজিওর অনুসন্ধান এবং উদ্ধার অভিযান অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অভিবাসনে উদ্বুদ্ধ করে- এমন দাবির সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ ভিত্তিহীন৷

এনজিও জাহাজগুলি কি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আরো বেশি করে সাগর পাড়ি দিতে উৎসাহিত করে? অভিবাসীরা কি সেকারণে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন? জানুয়ারির শুরুতে মাল্টার স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী বায়রন ক্যামিলেরি একাধিকবার এমন দাবি করেন৷ এই দাবি আদৌ সত্যি কি না তা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে গোটা বিষয়টি যাচাই করেছে সে দেশের ইংরেজি সংবাদপত্র টাইমস অফ মাল্টা৷।

সবকিছু যাচাইয়ের পর সংবাদপত্রটি জানিয়েছে, সমুদ্রে অভিবাসীদের উদ্ধারকারী এনজিওগুলির উপর ইটালির পদক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন ক্যামিলিরি ৷ তার বক্তব্য, "অনেকে বলে, এনজিওগুলি একটি পুলিং ফ্যাক্টর৷ ইটালি এনজিওগুলিকে পুল-ফ্যাক্টর হতে বাধা দিতে চাইছে।"

পুল-ফ্যাক্টর, অর্থাৎ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অভিবাসনে খুব উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়৷ ইইউ সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সসহ একাধিক সংস্থা আগেও এমন দাবি করেছে। টাইমস অব মাল্টা জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ফ্রন্টেক্সের রিপোর্টে বলা হয়, "লিবিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার কাছাকাছি এসএআর মিশনগুলি মানবপাচারকারীদের পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে এবং একটি পুল ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে৷" 

প্রমাণ কী

দাবিগুলি খতিয়ে দেখে তদন্ত করতে, একাধিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাশাপাশি এনজিও ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) বেশ কয়েকটি গবেষণার দিকে নজর দিয়েছে টাইমস।

ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের মাইগ্রেশন পলিসি সেন্টার (এমপিসি) এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের মধ্যে, "সমুদ্রপথে লিবিয়া ত্যাগ করা অভিবাসীদের সংখ্যার সঙ্গে বেসরকারি এসএআর উদ্ধার অভিযানের কোনো সংযোগ নেই৷ " বরং লিবিয়ার অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি পারাপারের চেষ্টা করা অভিবাসীদের সংখ্যায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল।

পিসা এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রধানত উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা বেশি ছিল যখন সেখানে সামান্যতম অনুসন্ধান এবং উদ্ধার কাজ চলছিল। 

টাইমস জানিয়েছে, গবেষকরা দেখেছেন, একই সময়সীমায় এসএআরের কম সক্রিয়তা এবং অভিবাসীদের উচ্চ মৃত্যুর হারের একটি সমানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে৷ ফলে এটা স্পষ্ট যে এনজিও জাহাজগুলি অভিবাসীদের পারাপারকে আরো নিরাপদ করে, বিপদের মুখে ঠেলে দেয় না।

এই সিদ্ধান্তগুলিকে সমর্থন করে আরো একটি গবেষণার ফলাফল ২০২২ সালে জার্মানির গবেষকরা প্রকাশ করেন৷ তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অনুসন্ধান-উদ্ধার কিন্তু অভিবাসনের কারণ নয়৷ জাহাজগুলি কখনো অনিয়মিত পারাপারে উৎসাহিত করে না।"

লন্ডন ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক আর্কিটেকচার এজেন্সি এবং এমএসএফের একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভূমধ্যসাগরে এসএআর অপারেশন অভিবাসী পারাপারে সেরকম কোনো প্রভাব ফেলেনি। মাইগ্রেশন পলিসি সেন্টার অর্থাত্ এমপিসি সমীক্ষার মতো, তারাও জানায়, অভিবাসীদের নিজের দেশের অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এগুলোই প্রাসঙ্গিক কারণ৷

২৫ অক্টোবরে জার্মান বেসরকারী সংস্থা সি-ওয়াচ দ্বারা প্রকাশিত এই হ্যান্ডআউট ফটোতে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাকারী অভিবাসীদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি খালি রাবারের নৌকা লিবিয়ার উপকূলরক্ষী দ্বারা বাধা দেওয়ার পরে আগুনে জ্বলতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ। (ফিওনা আলিহোসি/এপির মাধ্যমে সি-ওয়াচ)
২৫ অক্টোবরে জার্মান বেসরকারী সংস্থা সি-ওয়াচ দ্বারা প্রকাশিত এই হ্যান্ডআউট ফটোতে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাকারী অভিবাসীদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি খালি রাবারের নৌকা লিবিয়ার উপকূলরক্ষী দ্বারা বাধা দেওয়ার পরে আগুনে জ্বলতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ। (ফিওনা আলিহোসি/এপির মাধ্যমে সি-ওয়াচ)

টাইমস অফ মাল্টা দেখেছে, কয়েকটি গবেষণা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে এসএআর বোটের উপস্থিতি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করার জন্য আরও অভিবাসীদের উত্সাহিত করে। এটি 'সাগরে অভিবাসী: অনুসন্ধান এবং উদ্ধার অভিযানের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি' শীর্ষক একটি গবেষণায় "উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে৷ সেখানে দেখা গিয়েছে, তারা আরো অভিবাসীদের পারাপারের চেষ্টা করতে প্ররোচিত করে বলে মনে হচ্ছে।"

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য এবং মাত্তেও সালভিনির নেতৃত্বে ইটালির লেগা পার্টির সদস্য সুজানা সেকার্ডি গত সপ্তাহে স্ট্রাসবার্গে একটি বিতর্কের সময় এই গবেষণাটিকে "বৈজ্ঞানিক প্রমাণ" হিসাবে উল্লেখ করেছেন, সমুদ্রে এনজিও জাহাজের উপস্থিতি অভিবাসীদের কাছে একটি পুলিং ফ্যাক্টর। "

তিনি বলেন, ''তুরিন, কাগলিয়ারি এবং হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতদের যৌথ গবেষণা এটি নিশ্চিত করে৷ অভিবাসীরা যদি সমুদ্রে এনজিওগুলির উপস্থিতিতে আশ্বস্ত হয়৷ তবে নিরাপত্তার কথা না ভেবে ছোট নৌকা ইত্যাদিতে যাত্রা শুরু করে৷ এইভাবে নৌকা ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।"

'বেশিরভাগই মিথ্যা'

টাইমস অফ মাল্টা জানিয়েছে, এনজিও জাহাজগুলি অভিবাসীদের জন্য পুলিং ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে এই দাবিটিকে সরাসরি খারিজ করা অসম্ভব। কারণ,"তথ্যের সংবেদনশীলতা এবং অসম্পূর্ণ ডেটা"৷ ফ্রন্টেক্সের একটি ডেটা উল্লেখ করে তারা জানিয়েছে, চোরাকারবারীরা নিজেদের সুবিধার জন্য এনজিও জাহাজের উপস্থিতি ব্যবহার করে।

গবেষণার মূল অংশের উপর ভিত্তি করে মাল্টার সংবাদপত্র জানিয়েছে, এনজিওগুলি যে অভিবাসীদের পুল ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করে, সেই দাবি প্রমাণের মাধ্যমে খারিজ করা হয়েছে৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই দাবি মিথ্যা।


মারিও ম্যাকগ্রেগর/আরকেসি

 

অন্যান্য প্রতিবেদন