তালেবানের দখলে আফগানিস্তান | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স
তালেবানের দখলে আফগানিস্তান | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স

এই গল্পটি আফগান যুবক ওয়ালির যিনি বর্তমানে ইটালিতে আছেন। অথচ তার বাবা-মা আটকে আছে আফগানিস্তানে। ইটালিতে থাকার অনুমতি থাকা সত্ত্বেও ফিরতে পারছেন না তারা।

তিক্ততার সাথে ওয়ালি বলেন, "এই নরক থেকে বের করে আনতে আমি কিছু করতে পারছি না। আমার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে, কারণ আমি অপারগ।"

ওয়ালির মা-বাবা তাদের অন্তঃসত্ত্বা কন্যার সাথে দেখা করতে আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন। 

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ইটালিয়ান রেসিডেন্স পারমিট অর্থাৎ থাকার অনুমতি থাকা সত্ত্বেও তার বাবা-মা সেখান থেকে ফিরতে পারছেন না৷ 

২০০৮ সাল থেকে ইটালির বারি শহরে বাস করেন ওয়ালি। তার পরিবারের পাঁচ পুরুষ সদস্যের একজন ওয়ালি বারিতে একজন কালচারাল মিডিয়েটর বা সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করেন। 

কাজ করার পরেই অবশেষে ওয়ালি সফলভাবে তার মা-বাবাকে ইটালিতে নিয়ে আসতে পারে। 

পূরণ হয় তার মা-বাবার সাথে একসাথে থাকার স্বপ্ন, কিন্তু আবার প্রশ্নের মুখে তার এই স্বপ্নের বাস্তবতা। আফগানিস্তানে থাকা ওয়ালির আত্মীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন যে তালেবান 'একে একে সমস্ত অঙ্গরাজ্যের নিয়ন্ত্রণ' নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে।

'বদলা নিতে তালেবানরা বেছে নেয় পরিবারের পুরুষদেরই'

"প্রতিটা বাড়ির দরজায় করা নেড়ে নেড়ে তালেবানরা জানতে চায় মার্কিন সমর্থক কে আছে", জানায় ওয়ালি। "যাদের খুঁজছে, তাদের না পেলে পরিবারের বাকি সদস্যদের ওপর রাগ মেটায় তারা। কাউকে তুলে নিয়ে যায়, কোথায় কেউ জানেনা, বা সেখানেই মেরে ফেলে।"

ওয়ালি তার পরিবারকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে, কারণ তার দুই ভাই ন্যাটো'র জন্য অনুবাদকের কাজ করত। তার দুলাভাই কাজ করত আফগান সরকারের জন্য। 

"আমার দুই ভাই আফগানিস্তান ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারলেও আমার দুলাভাই এখনও সেখানে আছে। আমার বাবা ও দুই ভাই বাসা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়ে আছে", জানায় ওয়ালি। তার পরিবারের নারী সদস্যদের এখন রোজ নাটক করতে হয়, যেন তাদের পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য আর বাকি নেই।

"বদলা নেবার জন্য তালেবানরা বেছে নেয় শুধু পুরুষদেরই। আমার বাসায় এখন আছে শুধু আমার মা, বোন ও তাদের সন্তানেরা। গত রোববার তাদের সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা প্রচণ্ড আতঙ্কে আছেন। বাইরে বের হতে গেলে তাদের পর্দা করতে হয়, বোরকা পরতে হয়। 

দোকানে যেতে চাইলে তালেবান সমর্থকরা তাদের আটকায়, জিজ্ঞেস করে যে কেন পুরুষসঙ্গী ছাড়া একা বের হয়েছে তারা। আমার পরিবারের সদস্যরা তখন মিথ্যা বলে যে পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। কিন্তু এই মিথ্যা আর কত দিন?" প্রশ্ন করে ওয়ালি।

গ্রামাঞ্চলে তালেবান আরো ভয়ঙ্কর

ওয়ালির সবচেয়ে বেশি চিন্তা তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য, যাদের বয়স ৭৫ পেরিয়েছে। সে বলে, "তালেবানদের নিজেদের পারমিট দেখাতে এয়ারপোর্ট যেতে হয়, যা তারা এখন করতে পারবেন না। তালেবানই ঠিক করে দেয় কে এগোতে পারবে আর কে না। যদি তারা জানতে পারে যে আমার বাবা-মায়ের সন্তানরা মার্কিনদের জন্য কাজ করে, তাহলে সেখানেই তাদের মেরে ফেলবে।"

"টেলিভিশনে যা দেখায়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভয়ানক বাস্তব। টেলিভিশনে শুধু কাবুলের কথা বলে। কিন্তু রাজধানীর বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে তালেবানের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ ধরা পড়ছে। সেখানে তারা ইতিমধ্যে সব স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে", জানায় ওয়ালি। 

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও জানাচ্ছে যে বিনোদনধর্মী টেলিভিশন প্রোগ্রাম বর্তমানে বন্ধ, খবর পাওয়া গেছে এক সঞ্চালককে হত্যার।

জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআরের কাছে সহায়তা চেয়েছে ওয়ালি৷ কিন্তু "তারা আমাকে বলে যে তাদের পর্যাপ্ত অর্থ নেই, ফলে এখন সবকিছু নির্ভর করছে ইটালির ওপর, যদি তারা কোনো মানবিক পন্থা নিতে রাজি হয়।"

"পরিবারকে বাঁচিয়ে নিরাপদে ইটালি নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর" ওয়ালি তাই এখন কড়া নাড়ছে ইটালি কর্তৃপক্ষের দরজায়।

এসএস/আরআর (আনসা)