লিবিয়ায় ভিড় করছে বহু আফ্রিকান তরুণ অভিবাসনপ্রত্যাশী | ছবি: রয়টার্স
লিবিয়ায় ভিড় করছে বহু আফ্রিকান তরুণ অভিবাসনপ্রত্যাশী | ছবি: রয়টার্স

আগস্টে মাসের কোনো এক দিন ৪৩ বছর বয়সি ফিলি একটি ফোন পায় যা সে দুঃস্বপ্নেও আশা করেনি। খবর পান, তার ১৯ বছর বয়সি ভাই দাউদা লিবিয়ার এক কারাগারে মারা গেছে। ইনফোমাইগ্রেন্টসকে নিজের অভিজ্ঞতা জানালেন ফ্রান্সের বাসিন্দা ফিলি।

"আমার ১৯ বছর বয়সি ভাই দাউদার স্বপ্ন ছিল সে একদিন ফ্রান্সে আসবে। আমাদের বাবা বহু বছর ফ্রান্সে থাকার পর গিনিতে ফিরে গিয়ে ভাইয়ের ভিসার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। যেহেতু বাবার ফ্রান্স ও গিনি দুই দেশেরই নাগরিকত্ব আছে ও আমার জন্মও ফ্রান্সে, তাই আমরা আশাবাদী ছিলাম।’’

কিন্তু আমাদের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। আমার বা বাবার সাথে দেখা করতে ফ্রান্স আসার জন্য কয়েকদিনের ভিসাও পায়নি দাউদা।

(ফিলির বাবার প্রথম বিয়ের সময় ফিলির জন্ম হয় ফ্রান্সে। পরে অবসর নিয়ে তিনি গিনিতে ফিরে গেলে সেখানে দাউদার জন্ম হয়। ফিলি মাঝে কয়েকবার কনাক্রিতে তার ভাই ও বাবার সাথে দেখা করতে যান। শেষবারের মতো ২০১৯ সালে তাদের দেখা হয়েছিল।)

২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে আমাদের বাবা প্যারিসে আসেন। আমার কাছে কিছু টাকা রেখে যান তিনি, যদি কোনো উপায়ে দাউদা ভিসা পেতে সক্ষম হয়।

কিন্তু বাবা আসার কয়েক দিন পরেই আমরা জানতে পারি যে দাউদা দেশ ছেড়ে আলজেরিয়াতে রয়েছে। সেখান থেকে অবৈধ উপায়ে ফ্রান্সে আসার চেষ্টা করছে সে।

'লিবিয়ায় একবার ঢুকলে সব পথ বন্ধ'

দু'মাস পর মার্চে দাউদা জানায় যে, সে এখন লিবিয়াতে রয়েছে। আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি কারণ আমি জানি সেখানে অভিবাসীদের কী অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। আমি খুব অসহায় বোধ করি। আমি বলি যে দাউদা যাতে যে কোনো উপায়ে গিনি ফিরে যায়। সেখান থেকে বৈধ পথে তাকে ফ্রান্সে আনার চেষ্টা করব, সেটাও বলি।

কিন্তু একবার লিবিয়ায় পৌঁছালে সব শেষ হয়ে যায়। পালাবার পথ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে।

ডিঙিতে চেপে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে আসার জন্য দাউদা বাবার কাছে কিছু টাকা চায়। প্রথমে দোনামোনা করলেও পরে বাবা তাকে আড়াই হাজার ইউরো পাঠান। বাবার কাছে আর কোনো উপায়ও ছিল না। দাউদা লিবিয়ায় আটকে ছিল ও সাগর ছাড়া অন্য কোনো পথ তার সামনে খোলা ছিল না।

(ফিলি জানেননা কোন কারাগারে দাউদাকে রাখা হয়।)

৩১ জুলাই শেষবারের মতো দাউদা আমাদের ফোন করে। বাবার কাছে আরো টাকা চেয়ে কান্নাকাটি করে সে, যাতে কারাগার থেকে সে বেরোতে পারে। কিন্তু বাবা যতদিনে টাকা জোগাড় করলেন, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।

'জানোয়ারের মতো মারা হয় আমার ভাইকে'

আগস্টের শুরুতে আমরা প্রথমে লিবিয়া থেকে ও পরে গিনি থেকে ফোন পাই ( যা সম্ভত কারাগারের কর্মী বা মানবপাচারকারীদের কাছ থেকে বলে মূল প্রতিবেদকের ধারণা)। 

প্রথম ফোনে একজন আমাদের জানান যে, দাউদা আহত হয়েছে। 

এরপর দ্বিতীয় ফোনটি পাই। আমাদের বলা হয় যে, কারাগারেই মারা গেছে দাউদা। অন্য তরুণদের সাথে সে পালাতে চেষ্টা করলে রক্ষীদের গুলিতে মারা যায় সে। সেদিন সব মিলিয়ে ছয়জন মারা যায়।

আমি ক্ষুব্ধ৷ কারণ জানোয়ারের মতো মারা হয়েছে আমার ভাইকে।

(লিবিয়ায় বিভিন্ন সূত্রদের মারফত এই তথ্য নিশ্চিত করেছে ইনফোমাইগ্রেন্টস। রাজধানী ত্রিপলির বাইরে একটি কারাগারে আগস্টের শুরুতে গুলি চালনার ঘটনা ঘটে, যখন আটক অভিবাসীরা পালানোর চেষ্টা করেন। বহু মানুষ আহত হওয়া ছাড়াও সেদিন সত্যিই ছয়জন মারা যান।)

এই পরিস্থিতিতে আমার ভাইয়ের জন্য শোক প্রকাশও খুব কঠিন। আমাদের কাছে তার লাশ নেই, কবরও নেই। কোথায় গিয়ে তার জানাজা পড়ব?

দাউদা তরুণ ছিল, বাস্তবের জটিলতা সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল অস্পষ্ট। কতটা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছিল, তাও তার জানা ছিল না। সে সরাসরি সিংহের গুহায় গিয়ে পড়েছিল।

না জেনে এভাবে কতজন তরুণ আফ্রিকান মারা যায় রোজ? আমাদের বলা উচিত যে তারা যাতে কোনো অবস্থাতেই লিবিয়ায় না যায়। এটা একটা বিশাল বড় ফাঁদ!

এসএস/আরআর (মূল প্রতিবেদন: লেসলি কারেতেরো)