জার্মানিতে নিরাপদে আছেন জন (নাম পরিবর্তিত) | ছবি: মাজদা বুয়াজা/ইনফোমাইগ্রেন্টস
জার্মানিতে নিরাপদে আছেন জন (নাম পরিবর্তিত) | ছবি: মাজদা বুয়াজা/ইনফোমাইগ্রেন্টস

নিজের দেশ ক্যামেরুন ছাড়ার পর থেকে জন (নাম পরিবর্তিত) সাতটি দেশ ঘুরে অবশেষে লিবিয়ায় এসে অপহৃত হন। নভেম্বরে জার্মানিতে পৌঁছে আশ্রয়ের আবেদন করেন তিনি। এটা জনের জীবনের গল্প।

"আমার নাম জন, আমি ক্যামেরুন থেকে এসেছি।

আমি বেলারুশ হয়ে আসিনি। আমি টিউনিশিয়া থেকে ইটালির লাম্পেদুসা হয়ে তারপর ফ্রান্স ও অবশেষে জার্মানিতে এসেছি।

আমার বেশ কিছু বন্ধু ফ্রান্স বা বেলজিয়ামে থেকে গেছে। কিন্তু আমি অন্য কিছু দেখতে চাইছিলাম। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় থেকেই জার্মানি আমার স্বপ্ন ছিল। আমি দেশটির ইতিহাস নিয়ে খুবই আগ্রহী। আমি চাই বার্লিন প্রাচীর দেখতে।

কিন্তু এখানে আসার বৈধ কোনো পথ খোলা না থাকায় আমি এই কঠিন ও বিপজ্জনক পথে আসার সিদ্ধান্ত নিই। আমি অনেক কিছু ত্যাগ করেছি, অনেক ঝুঁকি নিয়েছি। কিন্তু আমি এসেছি এখানে।

'লিবিয়ায় অপহরণ'

প্রথমে আমি মিশর, মরক্কো হয়ে লিবিয়ায় আসি। তারপর আলজেরিয়া ও তারপর টিউনিশিয়া।

কিন্তু আমার যাত্রায় সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল লিবিয়ায়, সেখানে আমাকে দুমাস নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা হয়। আমি ত্রিপলিতে ছিলাম। সেখানে আমাকে অপহরণ করে নিয়েও তিনদিন রাখা হয়। তারপর একটা বিশাল অংকের মুক্তিপণ চায় আমার কাছে। সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীরা মানুষকে দীর্ঘ দিন গুম করে রাখে। কিন্তু আমি আর আমার বন্ধুরা তাড়াতাড়ি পালাতে সক্ষম হই।

কারাগার থেকে পালাবার সময় আমি বেড়া বেয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে যাই। সেটা প্রায় চার বা পাঁচ মিটার উঁচু ছিল বলে আমি পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। আমার বন্ধুরা আমাকে কিছুক্ষণ লুকিয়ে রাখে। একটু পরে, তারা আমায় হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার হাতে আঘাত লেগে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। দুসপ্তাহ আমি হাসপাতালে কাটাই। তারপর আমি দ্রুত মরক্কোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। তারপর সেখান থেকে আলজেরিয়া হয়ে টিউনিশিয়া পৌঁছি।

জনের হাতে আঘাতের চিহ্ন।
জনের হাতে আঘাতের চিহ্ন।

'ভয়াবহ ভূমধ্যসাগর'

এই সফর খুব বিপজ্জনক ছিল। ভূমধ্যসাগর পেরোনো মুখের কথা নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন ধরে সাগরে থাকতে হয়। আমরা কিছু খাইনি, পানিও না। ঈশ্বর ছাড়া আমাদের জন্য কেউ ছিল না সেখানে।

একটা ছোট নৌকায় প্রায় পাঁচশজন ছিলাম আমরা। একজন আরেকজনের ওপরে বসে ছিলাম। ২৮ ঘণ্টা ধরে যাত্রা করছিলাম আমরা, যাতে ইউরোপিয়ান অঞ্চলের সাগরে ঢুকতে পারি। আটজন শিশুও ছিল আমাদের সাথে। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হচ্ছে বিপন্ন শিশুদের নিজের চোখে দেখা।

সব অভিবাসনপ্রত্যাশীই ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানুষ, কেউ টিউনিশিয়া, কেউ আলজেরিয়া। কেউ কেউ আইভরি কোস্ট, গাম্বিয়া বা আফ্রিকার অন্যান্য দেশের মানুষ।

টিউনিশিয়ার সীমান্তরক্ষীরা আমাদের ধরে ফেরত নিয়ে যায়। কিন্তু ইটালিয়ানরা পরের বার আমাদের লাম্পেদুসা দ্বীপে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের কোনো অসম্মান করা হয়নি।

সেখান থেকেই আমাদের যাত্রা আবার শুরু হলো। ইটালিতে সীমান্তরক্ষীরা আমাদের কাপড়, খাবার, জুতা সব দিয়েছিল। কেউ অত্যাচার করেনি।

(ইটালি থেকে জন ফ্রান্স হয়ে জার্মানিতে আসে। ইনফোমাইগ্রেন্টসের সাথে তার দেখা হয় আইজেনহ্যুটেনস্টাট শহরে। শহরটি পূর্ব জার্মানির ব্রান্ডেনবুর্গ রাজ্যে অবস্থিত।)

আমি এখন জার্মানিতে তিন দিন ধরে আছি। প্রথমেই আমি সুযোগ পেলেই জার্মান ভাষা শিখব, তারপর কাজের চেষ্টা করব। আমি এখানে ভালো ভবিষ্যৎ তৈরি করতে এসেছি।"

এসএস/আরআর (মূল প্রতিবেদন: মারিয়ন ম্যাকগ্রেগর, মাজদা বুয়াজা)