পাব্রাদে শরণার্থী শিবিরে উপস্থিত সৈন্যদের একাংশ। ছবি: ডিআর
পাব্রাদে শরণার্থী শিবিরে উপস্থিত সৈন্যদের একাংশ। ছবি: ডিআর

লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস থেকে বেশ দূরে অবস্থিত পাব্রাদে শরণার্থী শিবিরে বন্দি আছেন আফ্রিকান অভিবাসী এরিক (ছদ্মনাম)। কয়েকমাস ধরে শরণার্থী শিবিরে অবরুদ্ধ এই ব্যক্তি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “লিথুয়ানিয়ান সৈন্যরা নিয়মিত শিবিরে এসে আশ্রয়পার্থীদের তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হয়রানি করছে।”

ইনফোমাইগ্রেন্টস লিথুয়ানিয়ার একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছে, সোমবার সকালে পাব্রাদে শরণার্থী শিবিরের বি এবং ডি সেক্টরে অভিবাসীদের একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পরে এরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লিথুয়ানিয়ান কর্তৃপক্ষ তাকে হাতকড়া পরিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে। ক্যাম্পের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তাকে মারধর করে মাটিতে ফেলে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরিক হাঁটতে পারছিল না।

পাশপাশি পাব্রাদে শরণার্থী শিবিরে সংবাদকর্মীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এরিক মূলত ইনফোমাইগ্রেন্টসকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন গত বুধবার। সাক্ষাৎকারে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রটিতে তার জীবনযাত্রার সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদেরকে বলেছিলেন। বিশেষত প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়ায় অভিবাসীদের কক্ষগুলোতে মাঝেমাঝে হিটার সচল না থাকার সমস্যাটি তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি ক্যাম্পে সামরিক বাহিনীর সরব উপস্থিতি এবং তাদের প্রতিদিন হয়রানির শিকার হওয়া সম্পর্কে কথা বলেছিলেন তিনি।

সাক্ষাৎকারের শুরুতে এরিক ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “বেলারুশিয়ানরা সীমান্ত খুলে দেয়ার পরে আট মাস আগে আমি লিথুয়ানিয়ায় পৌঁছেছিলাম। আমি প্রথমে কাবেলিয়াই সামরিক ঘাঁটির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম, তারপর সেখান থেকে আমাকে অন্য একটি শিবিরে পাঠানো হয়েছিল যেটির নাম আমার মনে নাই। সর্বশেষ আমাকে পাব্রাদে শিবিরে পাঠানো হয়। এই শিবিরটি বহুভাগে বিভক্ত। আমি বর্তমানে ক্যাম্পটির বি সেক্টরে আছি।”

তিনি বলেন, “এখানে প্রতিদিন সকালে সৈন্যরা আসে। তারা আমাদের গণনা করার জন্য সকালে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। তাদের জন্য এটা খুবই সাধারণ ঘটনা। প্রতিদিন ভোরে আমাদের কক্ষগুলোর দরজা খুলে তারা ভিতরে প্রবেশ করে। তারপর তারা আমাদের বিছানা থেকে উঠতে বলে এবং সবার পুরো নাম জিজ্ঞাসা করে।”

“সৈন্যরা আমাদের সাথে অপরাধীর মতো আচরণ করে।তারা মাঝে মাঝে সকাল ৬টা বা ৭টার দিকে আমাদের কক্ষে ঢুকে পড়ে। কিছু সৈন্য তাদের সাথে থাকা অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে, অন্যদের হাতে বিভিন্ন লাইট ও হ্যান্ডকাপ থাকে। অনেক সৈন্য মাঝে মাঝে কুকুর নিয়েও প্রবেশ করে। এটা সত্যিই কঠিন পরিস্থিতি। আমার জানামতে এসব কুকুর কখনো কাউকে কামড় দেয়নি৷ কিন্তু আমাদের ঘরে তাদের দেখে আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি,” যোগ করেন তিনি৷ 

লিথুয়ানিয়ান কর্তৃপক্ষ ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানায়, লিথুয়ানিয়ায় পাঁচটি অভিবাসী আটক কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে তিনটি কেন্দ্র সীমান্ত রক্ষী বা স্টেট বর্ডার গার্ড সার্ভিসের নির্দেশনায় রাখা হয়েছে। কড়া নজরদারি ও নির্দেশনায় থাকা কেন্দ্র তিনটি হলো পাব্রাদে, মেডিনিঙ্কাই এবং কিবারতাই কেন্দ্র। বাকী দুটি কেন্দ্র লিথুয়ানিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রম মন্ত্রণালয় দ্বারা পরিচালিত হয়। 

এরিক আরও বলেন, “প্রায় সময় ক্যাম্পের উঠানে সৈন্যদের প্রশিক্ষিত কুকুরগুলিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা সেখানে থাকলে আমরা বাইরে যেতে সাহস পাই না। কুকুরের ভয় আমাদের খুব বেশি প্রভাবিত করে। সৈন্যরা আমাদের ভয় দেখাতে ও লিথুয়ানিয়ায় থাকতে নিরুৎসাহিত করতে সব চেষ্টা করে। তারা জানে আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। যখন কুকুরগুলো বাইরে অবস্থান করে তখন আমাদেরকে কক্ষ থেকে বের হতে জোর করা হয়।”

“আমি ক্যাম্পের ভিতরে কখনও গুলির শব্দ শুনিনি। তবে একবার একজন সেনেগালের অভিবাসীকে শান্ত করতে সৈন্যরা তাদের হাতে থাকা রাসায়নিক স্পে ব্যবহার করেছিল।”

“আমি যখন বেলারুশে ছিলাম তখন আমি রাশিয়ান ভাষা শিখেছিলাম। আমি এই ভাষার অনেক কিছু বুঝি। লিথুয়ানিয়ান সৈন্যরা কিছু বললে আমি অনেকটা বুঝতে পাড়ি। তারা আমাদের অপমান করে, ‘এলিয়েন’ বা ‘ম্যাকাক’ বলে ডাকে।”

প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে লিথুয়ানিয়ার ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দেশটির জনসংখ্যার একটি অংশ রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে। লিথুয়ানিয়ার সাথে থাকা বেলারুশিয়ান সীমান্তের যত কাছে যাওয়া হয় ততই রাশিয়ান-ভাষী লিথুয়ানিয়ানদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। পাব্রাদে শরণার্থী শিবির যেই অঞ্চলে অবস্থিত সেখানেও রুশভাষী নাগরিকদের আধিক্য বেশি। 

লিথুয়ানিয়ান সংসদ ২০২১ সালের জুলাই মাসে সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোতে নতুন আসা অভিবাসীদের ছয় মাস বন্দি রাখার একটি আইন পাশ করে৷ কেন্দ্রগুলোতে বন্দি থাকা হাজার হাজার অভিবাসী ভেবেছিল ছয় মাস পার হলে হয়ত তারা মুক্ত হয়ে দ্রুত পশ্চিম ইউরোপের দিকে রওনা দিতে পারবে৷  

কিন্তু ২৩ ডিসেম্বর দেশটির সংসদ সদস্যরা আবারো অভিবাসীদের আটকের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেন৷ মেয়াদ বাড়িয়ে এখন এটি ছয় মাস থেকে এক বছর করা হয়েছে৷


এমএইউ/এআই