সার্বিয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তে অবস্থান করছেন একদল অভিবাসী | ছবি: ইপিএ
সার্বিয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তে অবস্থান করছেন একদল অভিবাসী | ছবি: ইপিএ

৪৭ বছর বয়সি বাংলাদেশি নাগরিক শাজিল হুসেন বাবুল ছাতক উপজেলার বাসিন্দা। মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির ফাঁদে পড়ে ক্রোয়েশিয়া যেতে রাজি হয়ে বর্তমানে নিঃস্ব এই বাংলাদেশি। এই ভুক্তভোগীর গ্রামেরই বাসিন্দা মানবপাচারে জড়িত বলে অভিযোগ ৷ দালালচক্র তাকে ক্রোয়েশিয়া পাঠাতে না পেরে শেষ মুহূর্তে পাঠিয়ে দেয় সার্বিয়াতে। অর্থনৈতিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়ে দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী। তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলাকে পুরো ঘটনা জানিয়েছেন।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে শাজিল হুসেন বাবুলকে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব দেন ইউনিয়নেরই এক পরিচিত ব্যক্তি। প্রস্তাবে বলা হয় ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়ায় কাজের ভিসায় নিয়ে যাওয়া হবে। বেতন থাকা-খাওয়া বাবদ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। 

শাজিল হোসেন বাবুল ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলাকে ব্যাখ্যা করেন, “প্রথম পর্যায়ে আমি আট লাখ টাকার চুক্তিতে ক্রোয়েশিয়া যাওয়ার জন্য রাজি হলে প্রাথমিকভাবে দালালকে ৩০ হাজার টাকা দিই। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনা শুরু হলে দীর্ঘদিন ভিসার অপেক্ষায় ছিলাম।”

তার বক্তব্য, “করোনা ভাইরাসের কারণে এক বছর অপেক্ষায় থাকার পরে ২০২০ সালে ডিসেম্বর মাসে ফোনে একটি ক্রোয়েশিয়ার কাজের ভিসার কপি দেখানো হয়। দালাল আমাকে জানায় যেন আমি দ্রুত আট লাখ টাকা জোগাড় করি। দ্রুত টাকা দিলে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চ মাসে ফ্লাইট দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়।”

শাজিল হোসেন আরও যোগ করেন, “৩০ হাজার টাকা দেয়ার পর আমি ক্রোয়েশিয়ার ভিসার কপি দেখে দালালের নিজের নামে থাকা সিলেটের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আড়াই লাখ টাকা জমা করি। পরবর্তীতে আরেক দফায় দালালের দুই ভাইয়ের সামনে সাড়ে তিন লাখ টাকা প্রদান করি। আমার একটি পৈতৃক জমি এবং স্ত্রীর সোনার গহনা বিক্রি করে পুরো টাকা জোগাড় করেছিলাম।” 

ক্রোয়েশিয়া পরিকল্পনা ব্যর্থ, দ্বিতীয় প্রস্তাব সার্বিয়া

ভুক্তভোগী ব্যক্তি পুরো টাকা দিলে ২০২১ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় আসতে বলা হয়। পরপর তিন দিন দালালের দেয়া ভিসায় ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ক্রোয়েশিয়ার বিমানে ওঠার চেষ্টা করলে প্রতিবারই অভিবাসন দপ্তর থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। 

শাজিল হোসেন অভিযোগ করেন, “এক সময়ে আমি বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রামে ফেরত আসি। স্থানীয় সবাইকে জানালে তারা সালিশি সভার আয়োজন করেন। এর মধ্যে দালাল আমাকে বলে আইনি জটিলতার জন্য ক্রোয়েশিয়ার ফ্লাইট করা সম্ভব হয়নি। সে প্রস্তাব দেয়, আমি চাইলে সার্বিয়া যেতে পারব। আমি জানাই আমি কোথাও যাব না। আমার সব টাকা ফেরত দাও।”

তিনি বলেন, “দালালের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার বেশ কঠিন এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন লোভনীয় প্রস্তাবের দিকে ভেবে আমি ছয় লাখ টাকার নতুন চুক্তিতে সার্বিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। দালাল জানায় আমার দেয়া অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা শীঘ্র ফেরত দেয়া হবে। কিছুদিন পরে এই দুই লাখ টাকা ফেরত পাই।”

নতুন চুক্তিতে রাজি হলেও শাজিল হোসেন বাবুলকে অপেক্ষা করতে হয়৷ ২০২১ সালের অক্টোবরে ভারতে অবস্থিত সার্বিয়া দূতাবাস থেকে ভিসা এসেছে বলে জানায় দালাল। 

এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসলে ঢাকার মহাখালির একটি হোটেলে দালালের এক পরিচিত ব্যক্তি ভিসাসহ যাবতীয় নথি বুঝিয়ে দেয়। ৩১ আগস্ট ২০২১ তারিখে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা জানান শাজিল হোসেন বাবুল। তিনি জানান ঢাকা থেকে এই দালালদের অধীনে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন তিনি৷ যাত্রাবিরতিতে দুবাই থেকে একই দালালের অধীনে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক তার সঙ্গে সার্বিয়া পাড়ি দেন।

চাকুরি নেই, মানসিক নির্যাতন ও ভয় ভীতি প্রদর্শন

সার্বিয়ায় ভালোভাবে পৌঁছালেও এবং একটি কাজের আবেদনসহ ভিসায় গেলেও কেন তিনি সেখানে থাকলেন না, তা জানতে চায় ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলা।

ভুক্তভোগী শাজিল হুসেন বাবুল
ভুক্তভোগী শাজিল হুসেন বাবুল


উত্তরে শাজিল জানান, “১ সেপ্টেম্বর বেলগ্রেডে যাওয়ার পর দালালের নেটওয়ার্কের একজন বাংলাদেশি ব্যক্তি আমাকে নিয়ে যায়। আমি সেখানে রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না এবং ভাষাও জানি না। আমাকে বলা হয়েছিল অপেক্ষাকৃত কম কষ্টের কোন কাজ দেয়া হবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর থেকে দালালের পরিচিত সেই ব্যক্তি আমার কাছ থেকে থাকা খাওয়া বাবদ ৫০০ ইউরো বা পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবি করেন। ৫০০ ইউরো তাকে দিতে বাধ্য হই।”

শাজিলের কথায়, “আমি একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগী৷ তাদের দেয়া নিয়মিত মানসিক চাপে অস্থির হয়ে পড়ছিলাম। একদিন তারা আমাকে বেলগ্রেড থেকে অনেক দূরে বড় গ্যারেজে কাজে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি, বড় বড় লোহার সামগ্রী বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা। আমি তাদেরকে জানাই আমার পক্ষে এত ভারি কাজ করা সম্ভব না। কাজ করতে না চাইলে তারা আমাকে আফগানদের হাতে তুলে দেবে এবং নির্যাতন করা হবে বলে শাসায়। আমি কোনোমতে সেখান থেকে পালিয়ে আসি।”

তিনি আরো বলেন, “বেলগ্রেডে একজন বাংলাদেশি আমার ভিসা দেখে জানান আমি চাইলে বাংলাদেশে ফেরত যেতে পারব কারণ ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আমার ভিসার মেয়াদ আছে। আমি জানতাম না এই ভিসা দিয়ে ফিরে আসতে পারব। জানার পর আমি আমার বোনকে ফোনে কান্নাকাটি করে জানাই যেন আমার জন্য বিমান টিকিট পাঠানো হয়। আমার বোন টিকিট পাঠালে আমি ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরি।”

মামলা, ন্যায় বিচার পাওয়ার আশা

মূলত সার্বিয়া যাওয়ার আগে দালালের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট সংস্থার আওতায় ভালো বেতনে কাজ দেয়া হবে। এই আশায় তিনি সার্বিয়ায় কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরে সেখানে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার আওতায় কাজ না পেয়ে মানসিক অত্যাচারে হতাশ হয়ে দেশে ফিরে আসার দাবি করেন শাজিল হোসেন । 

তিনি আরও জানান, “সার্বিয়ায় আমি যাদের সঙ্গে ছিলাম তাদের মধ্যে অনেক লোক অনিয়মিত পথে ইউরোপের শেঙ্গেন দেশগুলোতে ঢুকতে সীমান্তে থাকা ক্যাম্পের দিকে চলে যান। আমাকে এই ধরনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তবে সেসব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শেষে আমি একটি ঘরে একা ছিলাম। আমার সঙ্গে বাদল নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক ছিল৷ সার্বিয়ার ক্যাম্প থেকে ইটালি যাওয়ার পথে তার মারা যাওয়ার সংবাদ পাই।”

বর্তমানে তিনি আইনি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না জিজ্ঞেস করা হলে শাজিল হোসেন বাবুল বলেন, “দেশে ফিরে আসার পর আমি একজন আইনহজীবীর দ্বারস্থ হলে তিনি আমাকে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নিতে বলেন। ডিসেম্বর মাসে শীতকালীন ছুটিতে আদালত বন্ধ থাকায় আমি জানুয়ারি মাসে সুনামগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ আদালতে মানব পাচার আইনে দালালসহ তার পরিবারের সদস্যদেরও যুক্ত করে মামলা দায়ের করি।” 

তার কথায়, “মামলা দায়ের করার পর আদালত তদন্তের কার্যক্রম পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে দিয়েছে। আমি ছয় জন সাক্ষীসহ সমস্ত তথ্য ও নথি আদালতে পেশ করেছি। আশা করছি দ্রুত পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে এবং ন্যায় বিচারপ্রাপ্তির পথ সুগম হবে।” 

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিরা অনেক সময় বড় পাচার চক্রের স্থানীয় প্রতিনিধিদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারান। বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করে বিদেশে গিয়ে তা কখন আয় করতে পারবেন সেটিও মাথায় রাখেন না অনেকে। শাজিল হোসেন বাবুলের মতো বহু লোক জায়গা জমি ও সোনাসহ শেষ সম্বল বিক্রি করে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথ বেছে নেন। 


 এমএইউ/আরকেসি