ফ্রান্সের ক্লেরমো ফেরো শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই আশ্রয়কেন্দ্রের একটি ঘরে ফ্রাঙ্ক এখন তার পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। ছবি: ডিআর
ফ্রান্সের ক্লেরমো ফেরো শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই আশ্রয়কেন্দ্রের একটি ঘরে ফ্রাঙ্ক এখন তার পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। ছবি: ডিআর

দুই বছর ধরে ইনফোমাইগ্রেন্টসের সম্পাদকীয় দলের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন আফ্রিকার দেশ কঙ্গো থেকে আসা শরণার্থী ফ্রাঙ্ক (ছদ্মনাম)। ইতিপূর্বে তিনি দুবার গ্রিসের সামোস শরণার্থী শিবিরে থাকা অবস্থায় সেখানকার দুর্দশার কথা জানিয়েছিলেন। নিজ পরিবার নিয়ে তিনি এখন ফ্রান্সের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে বসবাস করছেন। গ্রিস থেকে ফ্রান্সে এসে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন এই শরণার্থী। বিস্তারিত পড়ুন সাক্ষাৎকারে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রাঙ্ক ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানিয়েছিলেন, তিনি গ্রিসের সামোস ক্যাম্পের কাছে ত্রিপল এবং কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছেন। চল্লিশ বছর বয়সি এই আশ্রয়প্রার্থী আগের বছর তার দুই মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে গ্রিক দ্বীপ সামোসে এসেছিলেন। সে সময় তার আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াকরণের অপেক্ষায় ছিল।

২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, ফ্রাঙ্ক ইনফোমাইগ্রেন্টসের সম্পাদকীয় দলের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করেন। তিনি তখন গ্রিসে শরণার্থী মর্যাদা পেয়েছিলেন, কিন্তু কাজের অভাবে এবং নিজের অবস্থান সংহত করতে বেগ পেতে হচ্ছিল তাকে। কোন বিকল্প না থাকায় তিনি ও তার পরিবার অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থায় সামোস ক্যাম্পে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।

পড়ুন>>তুরস্ক ও গ্রিসের ‘তিক্ত সম্পর্কে’ আটকা অভিবাসীদের ভাগ্য

এরইমধ্যে তার স্ত্রী আরেকটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেয়৷ সেসময় তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেছিলেন, তিনি নিজেকে এখন "পরিত্যক্ত" মনে করছেন এবং এই অবস্থা থেকে কীভাবে বের হবেন জানেন না।

কিন্তু আজ তার অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং ফ্রাঙ্ক আবারও হাসছেন। 

ফ্রাঙ্ক অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘‘২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা একটি এনজিওর সাহায্যে সামোস ছেড়ে এথেন্সের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এনজিওটির প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ কারণ তাদের সাহায্যে আমরা বাসস্থান পাই। হেলিওস প্রকল্প থেকে দেওয়া অর্থ দিয়ে আমরা বাসা ভাড়া পরিশোধ করেছি, কিন্তু মাসের শেষে খরচ চালিয়ে নেয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। এই টাকা দিয়ে আমাদেরকে সবকিছু করতে হতো। শুধুমাত্র ৩৫০ ইউরো চলে যেত বাসা ভাড়ার পেছনে।’’ 

উল্লেখ্য, গ্রিসে ২০১৯ সাল থেকে ‘হেলিওস’ নামক একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে শরণার্থী মর্যাদাপ্রাপ্তদের আবাসন সহায়তা প্রদান করে এবং তাদেরকে গ্রিক সমাজে একীভূতকরণে সহায়তা করে। ফ্রাঙ্কের মতো স্ত্রী ও সন্তান থাকা পরিবারগুলোর জন্য এই প্রোগ্রামের আওতায় এক বছরের জন্য প্রতি মাসে ৫০৪ ইউরো বা ৫০ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হয়। একক নারী ও পুরুষদের জন্য এই আর্থিক ভাতার পরিমাণ অনেক কম হবে। 

হেলিওস প্রকল্পটি ইউরোপীয় কমিশনের অর্থায়নে এবং গ্রিক অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

আমি আমার পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে হেলিওসকে গ্রিসে একটি পেশাদার প্রশিক্ষণের জন্যও বলেছিলাম। আমি আমার দেশে একজন ট্রাক ড্রাইভার ছিলাম এবং গ্রিসেও এই পেশা পুনরায় শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে কোনো পরামর্শ ও সহায়তা করা হয়নি। গ্রিসে আপনি ভাষা না জানলে কোনো কাজ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

হেলিওস প্রোগ্রাম মূলত বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত শরণার্থীদের কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি এবং গ্রিসে চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা প্রদান করে। এটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এবং শরণার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দেয়ার কথা বললেও বাস্তবে গ্রিসে সংহত অবস্থান তৈরি করা খুব কঠিন। ২০০৮ সাল থেকে আর্থিক সংকটে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করছে। 

‘আমার স্ত্রী এবং তিন সন্তান নিয়ে এথেন্সের রাস্তায় ঘুমিয়েছি’

ফ্রাঙ্ক ব্যাখ্যা করেন, “যখন হেলিওস প্রোগ্রামের ১২ মাসের আর্থিক সাহায্য শেষ হয়ে গেল, তখন আমরা সরকারের কাছ থেকে কিছু পাইনি। পরবর্তীতে আমাদের ভাড়া বাসা ছেড়ে যেতে হয়েছিল। আমার স্ত্রী এবং তিন সন্তান নিয়ে বেশ কয়েকদিন এথেন্সের রাস্তায় ঘুমিয়েছিলাম।”

“সামোস দ্বীপে পরিচয় হওয়া একজন ক্যামেরুনের নাগরিকের সাথে আমি এথেন্সে দেখা করি। তিনি আমাকে একজন যাজকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। উক্ত যাজক আমাদেরকে তার গির্জায় আতিথেয়তা করেছিলেন। আমরা সেখানে দুই মাস ছিলাম। সেই সময় আমরা ভবিষ্যতে কী করতে যাচ্ছি তা নিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেছি।”

পড়ুন>>৪০ হাজার অবৈধ প্রবেশ আটকে দিয়েছে গ্রিস

যেহেতু আমাদের পরিবারে সবাই ফরাসিভাষী ছিলাম, তাই আমরা ফ্রান্সে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা ভেবেছিলাম এটা চাকরি পেতে এবং শিশুদের জন্যেও সহজ হবে। আমি হেলিওস থেকে পাওয়া শেষ মাসের টাকা রেখে দিয়েছিলাম, এই ভেবে যে এটি ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। আমরা এই টাকা প্যারিসে প্লেনের টিকিট কেনার জন্য ব্যবহার করেছি।

আমরা ১৫ এপ্রিল প্যারিসের দক্ষিণে অবস্থিত অরলি বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। আমরা এখানে কাউকে চিনতাম না। আমরা হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গিয়েছিলাম, আমরা কোথায় যাবো তা জানতাম না।

আরও পড়ুন>>মাল্টায় অভিবাসীর সংখ্যা কমছে?

একজন ফরাসি মহিলা যিনি আমাদের সাথে একই বিমানে এসেছিলেন তিনি পথিমধ্যে আমাদের কষ্ট লক্ষ্য করেছিলেন। এক পর্যায়ে সব বলার পরে বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলে অবস্থিত তার বাড়িতে আমাদেরকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যতক্ষণ না আমরা একটি সমাধান খুঁজে পাই আমরা সেখানে থাকতে পারব। আমরা তার অ্যাপার্টমেন্টে চার দিন ছিলাম। তারপর আমরা সেখান থেকে কাছে অবস্থিত একটি ক্যাম্পে কয়েক রাত কাটিয়েছিলাম।

‘আমার মেয়েরা ফ্রান্সে খুব খুশি’

ক্যাম্প থেকে আমি ফরাসি প্রশাসনিক দপ্তর অফির টেলিফোন সার্ভিসে যোগাযোগ করি এবং তাদের পরামর্শে কোয়ালিয়া নামক অভিবাসন সংস্থায় যাই। তারা আমাদের আশ্রয় আবেদনের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে স্থানীয় একটি প্রেফেকচুরে পাঠায়। আমরা রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করলে আবারও ৫ মে তারিখে অফি-তে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়।

বি: দ্র: বৃহত্তরপ্যারিস বা ইল-দ্য-ফ্রন্সঁ অঞ্চলে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের অবশ্যই আশ্রয় আবেদনের প্রথম সাক্ষ্যকার পেতে ফ্রেঞ্চ অফিস ফর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন (অফি) তে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। সাধারনত সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৩:৩০ পর্যন্ত এই ০১ ৪২ ৫০০ ৯০০ নম্বরে ফোন দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। 

অফি-তে আমাদের সাক্ষাৎকার চলাকালীন সময়ে আমাদেরকে ক্লেরমো-ফেরো শহরে থেকে প্রায় পনের কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাঁ-বুজির নামক একটি কাদা বা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য অভ্যর্থনা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। 

এটি একটি প্রাক্তন অবকাশ কেন্দ্র, যেটিকে বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে রুপান্তর করা হয়েছে। আমাদের পাঁচজনের পরিবারের জন্য একটি কটেজ দেয়া হয়েছে। যেহেতু আমরা ফ্রান্সে আছি, এটা আনন্দের। আমাদের মনোবল ভালো, আমার মাথায় আর কোন নেতিবাচক চিন্তা নেই।

গ্রিসে তিন বছরের অগ্নিপরীক্ষার পর বর্তমান সময় আমাদের কাছে অকল্পনীয়। আমার ৯ ও ৪ বছর বয়সি দুই মেয়ে এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। আমার ছোট সন্তানের বয়স মাত্র দেড় বছর তাই সে আপাতর আমাদের সাথে থাকে। আমার বাচ্চারা এখানে অনেক খুশি। দুপুরের শেষে যখন আমরা তাদেরকে স্কুল থেকে নিয়ে আসি তারা আমাদেরকে স্কুলে কী করেছে তা বলে এবং সেগুলো বেশ মজার। আমরা গ্রিসে একদিনের জন্যেও এমন আতিথেয়তা পাইনি।

আমরা আবার ফ্রান্সে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছি। আমরা ফাইলটি ফরাসি আশ্রয় বিষয়ক দপ্তর অফপ্রায় পাঠিয়েছি এবং আমরা সাক্ষাৎকারের তারিখের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি জানি এটা কঠিন হতে পারে কারণ আমরা ইতিমধ্যে গ্রিসে সুরক্ষা পেয়েছিলাম কিন্তু সেখানে সমাজে একীভূত হওয়া প্রায়ই অসম্ভব ছিল।

ডাবলিন বিধিমালা অনুসারে, একজন স্বীকৃত শরণার্থী অন্য দেশে পুনরায় আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে পারে না: সেই হিসেবে গ্রিস থেকে আসা ব্যক্তিদের প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে এসব আবেদন সফল হয়, কারণ গ্রিক সমাজে ইন্ট্রিগ্রেশন বা একীকরণের ও সংহত হতে বড় সমস্যা রয়েছে।

আরও পড়ুন>>এজিয়ান সাগরে পুশব্যাক: ফ্রন্টেক্স প্রধানের পদত্যাগ

ফ্রাঙ্ক বলেন, “আমার প্রত্যাশা সফল হবো। আমি গ্রিসে আমাদের অনিশ্চিত দৈনন্দিন জীবনের সব প্রমাণ নিয়ে এসেছি। আশা করি ভালো কিছুই হবে। আমি ফরাসি সমাজের বোঝা হতে চাই না এবং আমার পরিবারকে সহায়তা জন্য কাজ করতে চাই। আমি আবারও আমার ট্রাক চালকের পেশায় ফিরে যেতে চাই এবং আমার সন্তানদের উন্নত জীবন দিতে চাই।”


মূল প্রতিবেদন লেসলি কারেতেরো। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/এআই