অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টার চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়াই ঠিক মনে করছেন মোহাম্মদ সামাদ | ছবি: প্রাইভেট
অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টার চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়াই ঠিক মনে করছেন মোহাম্মদ সামাদ | ছবি: প্রাইভেট

টানা চার বছর ধরে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন দেশে ফিরতে চান মোহাম্মদ সামাদ (ছদ্মনাম)৷ সম্প্রতি তুরস্কের পুলিশ তাকে ইরানে বিতাড়িত করেছে৷ সেখানকার সীমান্তে অভিবাসীদের উপর চরম নির্যাতন করা হয় বলে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানিয়েছেন সিলেটের এই বাসিন্দা৷

উন্নত জীবনের আশায় চারবছর আগে দেশ ছেড়েছিলেন মোহাম্মদ সামাদ৷ তার লক্ষ্য ছিল ইটালি যাওয়ার৷ কিন্তু বৈধপথে সেদেশে যাওয়ার চেষ্টা না করে বিপজ্জনক এক পথ বেছে নেন তিনি৷ বর্তমানে ২৭ বছর বয়সি এই বাংলাদেশি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ‘‘আমি ইটালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেড় বছর আগে তুরস্কে পৌঁছাই৷ তারও কয়েকবছর আগে দালালকে সাত লাখ টাকা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ওমান যাই এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে ঢুকি৷ সবমিলিয়ে চার বছরের মতো সময় কেটে গেছে৷’’ 

‘‘এই পথে ইউরোপে ঢুকতে গেলে কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়৷ কখনো পুলিশ গ্রেপ্তার করে, জেল খাটতে হয়, তারপর আবার চেষ্টা করতে হয়৷ অনেকের অনেক বছর লেগে যায় এভাবে গেম মারতে,’’ যোগ করেন তিনি৷ 

তুরস্কে চলছে অভিবাসীদের ধরপাকড়

দেড় বছর তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থান করলেও সেখান থেকে অনিয়মিত পথে ইউরোপে ঢোকার সুযোগ পাননি সামাদ৷ পাননি তুরস্কে থাকার বৈধ অনুমতিও৷ বরং দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অনিয়মিত অভিবাসীদের উপর রিচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ান সরকারকে বেশ চড়াও হতে দেখেছেন তিনি৷ তাদেরকে ব্যাপকহারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে জানান এই বাংলাদেশি নাগরিক৷

পড়ুন>>গ্রিস থেকে ফ্রান্সে যাওয়ার পথে বাংলাদেশি অভিবাসীর মৃত্যু

সামাদ বলেন, ‘‘ইস্তাম্বুলে আমি বৈধ ছিলাম না, তবে কোনো অপরাধেও জড়াইনি৷ আমার মতো হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে৷ রাস্তা থেকে বা যেখানে কাজ করছেন সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ৷’’

তেহরান থেকে দেশে ফেরাও অনেক কঠিন বলে জানান তিনি | ছবি: প্রাইভেট
তেহরান থেকে দেশে ফেরাও অনেক কঠিন বলে জানান তিনি | ছবি: প্রাইভেট


‘‘একসপ্তাহে আগে আমাকে গ্রেপ্তার করার পর ৩৫ ঘণ্টা গাড়িতে করে ইরানের সীমান্তবর্তী তুর্কি শহর ভেনে নিয়ে যায়৷ সেখানে আমাদের তিনদিন রাখা হয়৷ তখন আরো কয়েকজন বাংলাদেশি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় যারা দুই থেকে আড়াই মাস জেলে ছিলেন,’’ বলেন এই বাংলাদেশি নাগরিক৷ 

‘‘এরপর আমাদের সবাইকে একসাথে সীমান্তে নিয়ে ইরানে বিতাড়িত করে৷ আমরা ১২৮ জন ছিলাম৷ এরমধ্যে বাঙালি ১১০ জনের মতো৷ বাকিদের মধ্যে তিনজন আফগান এবং বাকিরা পাকিস্তানি,’’ যোগ করেন তিনি৷   

তুরস্ক-ইরান সীমান্তে টাকার জন্য নির্যাতন

সীমান্তের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে সামাদ বলেন, ‘‘বিতাড়নের সেসময় পুলিশ গুলি করে৷ আর সেই গুলির শব্দ শুনে সেখানকার ইরানিরা লাঠিসোটা এবং কুকুর নিয়ে সীমান্তে চলে আসে৷ এরপর তারা অভিবাসীদের ধরে নিয়ে যায় এবং টাকার জন্য তাদের উপর নির্যাতন করে৷ এভাবে প্রতিনিয়ত তুরস্ক থেকে ইরানে অভিবাসীদের বিতাড়ন করা হচ্ছে৷’’

পড়ুন>>এক মাসে ২২০০ বাংলাদেশির ইউরোপে আশ্রয় আবেদন

সামাদ জানান, তুরস্ক-ইরান সীমান্তে মূলত ইরানিরা অভিবাসীদের নির্যাতন করে৷ তবে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশি আদমব্যাপারীদেরও যোগাযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি৷ 

বাংলাদেশি এই নাগরিক বলেন, ‘‘অভিবাসীদের আটকে রাখার পর তারা যাদের মাধ্যমে এই পথে এসেছিলেন সেই দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন জিম্মিকারীরা৷ তখন তাদের সাথে যোগাযোগ করলে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয়৷ মানব পাচারকারীদের কাছে অনেক অভিবাসীর টাকা জমা থাকে৷ সেখান থেকে তারা টাকা দিয়ে দেয় বা দেশ থেকে টাকা এনে আবার তাদের দিতে হয়৷ তারা অনেক সময় যে টাকা দিয়ে সীমান্ত থেকে ছাড়িয়ে নেয় তারচেয়েও বেশি টাকা আবার অভিবাসীদের কাছ থেকে আদায় করে৷’’ 

নির্যাতন থেকে বাঁচতে সামাদ অবশ্য জিম্মি হওয়ার পর টাকা দিতে বেশি দেরি করেননি৷ তবে, অন্য অভিবাসীদের নির্যাতিত হতে দেখেছেন তিনি৷ সিলেটের আরেক অভিবাসী সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলেও ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান তিনি৷ এসংক্রান্ত কিছু ছবি এবং ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন তিনি৷ 

পড়ুন>>আয়ারল্যান্ডে নিয়মিত হচ্ছেন অনথিভুক্ত বাংলাদেশিরা

সামাদ বলেন, ‘‘যারা শুরুর দিকে টাকা দিয়ে দেয় তাদেরকে নির্যাতন করা হয় না।কিন্তু টাকা না দিলে সে যে দেশের অভিবাসীই হোক না কেন, নির্যাতন করা হয়৷ মূলত বাংলাদেশি, পাকিস্তানি এবং আফগানরা এই পথ দিয়ে তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন৷’’

‘‘তুরস্কে আমাকে পুলিশ মারধর করেছিল৷ তারপর ইরান সীমান্তে আসার পর এক ইরানি আমাকে আটকে রেখে ৫০০ ডলারের মতো আদায় করেছে,’’ যোগ করেন তিনি৷ 


‘‘সাধারণত দ্রুত টাকা না দিলে যে ব্যক্তি আপনাকে আটক করেছেন তিনি অন্য কারো কাছে আপনাকে বিক্রি করে দেবেন৷ আর যতবার আপনি হাতবদল হবেন ততবারই টাকার পরিমান বাড়তে থাকবে৷ টাকা দেয়ার পর কয়েকজন একত্র হয়ে তেহরান চলে যাওয়া যায়৷’’ 

অবশেষে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত

ইরান সীমান্তে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর এখন আর অনিয়মিত পথে ইউরোপে যেতে চান না মোহাম্মদ সামাদ৷ তিনি ইরান থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন৷ তবে এক্ষেত্রেও নানা বাধা রয়েছে বলে জানান তিনি৷ 

‘‘তেহরানের বাংলাদেশের দূতাবাসে শীঘ্রই ফেরত যেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেবো৷ কিন্তু তারপরও দেশে যেতে নাকি পাঁচ থেকে ছয়মাস সময় লাগবে৷ এটা একটা সমস্যা,’’ বলেন সামাদ৷  

পড়ুন>>বেলজিয়ামে মানব পাচারের শিকার ১৭ বাংলাদেশি

ইরানে এখন হাজার হাজার বাংলাদেশি বেকার সময় কাটাচ্ছেন বলেও জানান তিনি৷ তাদের অনেকেই দেশ থেকে টাকা এনে চলছেন৷ কিন্তু দেশে ফিরতে পারছেন না৷ 

‘‘ইরানে স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরি করা যায় না৷ এদেশের অনেকে অভিবাসীদের রাস্তাঘাট থেকে ধরে নিয়ে জিম্মি করে টাকপয়সা নিয়ে নেয়,’’ বলেন সামাদ৷